বই ও আমাদের বইমেলা

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ০২:২৩

মানুষ কেন বই পড়ে? একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বই পড়ার ১০টি কারণ বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—স্মৃতিশক্তি বাড়ানো, বলার দক্ষতা বৃদ্ধি, চিন্তার স্বচ্ছতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, মনঃসংযোগ, লিখবার দক্ষতা, বিনোদনের জন্য, অবসাদ কাটানো ইত্যাদি কারণে বই পড়ে মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে প্রথমে যে বিষয়টিকে তারা রেখেছে সেটি হচ্ছে—‘মানসিক উদ্দীপনা’। বই পড়লে মানুষ মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত হয়। সেই কারণেই বই পড়ে। যখন কেউ বই পড়ে তখন কল্পনার জগতে প্রবেশ করে। যা বিশ্বাস করত না, তা বিশ্বাস করে অনুপ্রাণিত হয়, বইয়ের প্রাণহীন পাতাগুলো মানুষের মনের স্পর্শে যেন প্রাণ পায়, আর সে কারণেই আধুনিক বিজ্ঞানের এই যুগেও বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি মানুষ।

বই পড়ার অভ্যাস কি কমে আসছে মানুষের মধ্যে—ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে। তিনি বলেছিলেন—এই দায়িত্ব শুধু মানুষের নয়, লেখকেরও। লেখককেও সমাজের, বিজ্ঞানের গতির সঙ্গে এগিয়ে চলতে হয়, না হলে পাঠকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেই। তিনি বলেছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাব ও অভিগমন মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত পড়ে। মানুষও প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যায়। এই পারস্পরিক প্রভাব খুব গভীর। এই প্রভাবটা ভাষার ওপর এসেও পড়ে। একজন লেখক যত দ্রুত এই পরিবর্তনকে উপলব্ধি করতে পারবে, পরিবর্তনকে বুঝে নিয়ে লিখতে পারবে, ততই সে সক্রিয় থাকবে।

তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটছে। আমাদের ছোটবেলায় এ পরিবর্তন হতো ধীরে ধীরে। হারিকেন থেকে বিজলিবাতির পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগেছে। রেডিও এসেছে সেখান থেকে টেলিভিশনের আবির্ভাবেও সময় লেগেছে অনেক। মানুষ প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিত। এখন এটা খুব দ্রুত ও নানাভাবে ঘটছে। আর মানুষ এই পরিবর্তনকে নানাভাবে দেখছে। সেই পরিবর্তনের ঘূর্ণিপাকে পড়েছে বলেই, আপাতভাবে মনে হচ্ছে—বই মানুষ কম পড়ছে।

তবে, বাংলাদেশের বইমেলা দেখে কেউ বলবে না বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বরং যারা ২০ বছর আগের বইমেলাকে দেখেছেন তারা এখনকার বইমেলাকে দেখলে বলতে বাধ্য হবেন বইমেলা, বইয়ের প্রকাশনা, লেখক ও পাঠক বাড়ছে। বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমেনি। আর এই অবস্থা সৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার অবদান সবচেয়ে বেশি।

আমাদের বইমেলা :বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। বইমেলার চিন্তাটি এ দেশে প্রথম মাথায় আসে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দে র সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীনের। তিনি বাংলা একাডেমিতেও একসময় চাকরি করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি গ্রন্থকেন্দে র পরিচালক পদে নিয়োগ পান। এ সময় শিশু গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তত্কালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায়। সম্ভবত, এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। এরপরে ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তিনি। এই মেলায় সরদার জয়েনউদদীন একটি মজার কাণ্ড করেছিলেন। মেলার ভেতরে একটি গরু বেঁধে তার গায়ে লিখে রাখা হয়েছিল ‘আমি বই পড়ি না’। মানুষকে গ্রন্থপাঠে আগ্রহী করে তুলতেই সরদার জয়েনউদদীনের এই অভিনব প্রয়াস ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরপরে ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দে র পরিচালক, তখন ইউনেসকো ঐ বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। গ্রন্থমেলায় আগ্রহী সরদার সাহেব এই আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা। এদিকে, ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এই বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি, এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।

১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা সাহেব যখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, তখন তিনি বাংলা একাডেমির আয়োজনে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ঐ মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোত্সর্গের যে ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই মাসে আয়োজিত বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।

বইমেলা প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান বলেন, প্রতি বছর বইমেলার কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেলা উপলক্ষ্যে বিপুল বই প্রকাশিত হয়। বলা চলে এই মেলা উপলক্ষ্য করেই বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এখন অনেক নতুন প্রকাশক এই শিল্পে এসেছেন। পাঠকের সংখ্যাও প্রতি বছর বাড়ছে। এই মেলা এক মাস ধরে চলে। পৃথিবীতে আর কোনো বইমেলাই এত দিন ধরে চলে না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটি পৃথিবীর দীর্ঘদিনব্যাপী আয়োজিত একটি বইমেলা। মেলার পরিসর বাড়িয়ে এর একটি বড় অংশকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর ফলে অমর একুশের স্মৃতিবাহী এই মেলাটির ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটল। যে মেলা একুশের মহান ঐতিহ্যকে ধারণ করে এত বিশাল আকার ধারণ করেছে, তা এখন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই স্থান থেকেই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাঙালির মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। এখানেই রয়েছে স্বাধীনতাস্তম্ভ এবং শিখা চিরন্তন। আরো আছে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ও স্বাধীনতা-জাদুঘর। তাই এখানে বইমেলা সম্প্রসারিত হওয়ায় বাংলাদেশের বাঙালির জাতিসত্তার উদ্বোধনের স্মৃতিবাহী একুশের ঐতিহ্যের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা যুক্ত হয়ে মেলাটি এখন নতুন আঙ্গিক, পরিসর ও মাত্রিকতায় স্থিত হয়েছে।
ইত্তেফাক/এমএএম