আজ আন্তর্জাতিক নদী কৃত্য দিবস

‘সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে নদী রক্ষার বিকল্প নেই’

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২১, ০০:৪২

অব্যাহত দখল, অবকাঠামো ও দূষণে ধ্বংসের মুখে সারা দেশের নদনদী-জলাশয়। জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ আইন-১৯৯৭ ও হাইকোর্টের সব রায় মেনে সব নদীর সীমানা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, নদী রক্ষা না হলে দেশ রক্ষা হবে না। প্রধানমন্ত্রী নদী রক্ষায় তার দৃঢ় প্রত্যয় বারবার প্রকাশ করেছেন। নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে, তারা আন্তরিক থেকেও নির্বাহী ক্ষমতার অভাবে খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না। আমাদের প্রয়োজন নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী নদী কমিশন। তবে আমাদের উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছে। অতএব, এই সত্তার ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করাও সরকারসহ আমাদের সবার দায়িত্ব।

বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা আজ ব্যাপকভাবে নদী বিপর্যয়ের শিকার। অধিকাংশ নদীই নাব্য হারিয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ মূলত গঙ্গা-বহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর পলি মাটি দিয়ে গঠিত একটি বদ্বীপভূমি। একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। নদীগুলো ছিল প্রশস্ত। নদীর গভীরতা ছিল। বর্ষাকালে এসব নদী থাকত প্রমত্তা। এখন সে অবস্থা নেই। সারা বছর নাব্য থাকে এমন নদীর সংখ্যা এখন সর্বসাকুল্যে ২৩০টি।

জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কার্যনির্বাহী সহসভাপতি ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, আমাদের দেশে কলকারখানাগুলোই নদী দূষণের প্রধান উত্স। ২০০৮ সালের এক সরকারি গবেষণায় এ তথ্য জানা যায়। এসব থেকে নানা রকম দীর্ঘস্থায়ী বিষাক্ত তরল দূষক পরিবেশের সীমাহীন ক্ষতি করে চলছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত ৯টি দীর্ঘস্থায়ী জৈব দূষক : এলড্রিন, ক্লোরডেন, ডিডিটি, ডাইএলড্রিন, এনড্রিন, হেপ্টক্লোর, হেক্সাক্লোর বেনজিন, মিরেক্স ও টক্সাফেন। এগুলো ১৯৯৮ সালে সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ হলেও এর সাতটি বাংলাদেশে এখনও ব্যবহূত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

আজ ১৪ মার্চ, আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস বা আন্তর্জাতিক নদী রক্ষায় করণীয় দিবস। সারা বিশ্বে বেসরকারি পর্যায়ে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। নদীর প্রতি আমাদের করণীয়, নদী রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব, কতটুকু দায়বদ্ধতা তা উপলব্ধি ও স্মরণ করিয়ে দিতেই এমন দিবস পালনের সূচনা। দিবসটি উপলক্ষ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও নানা কর্মসূচি পালন করে। ১৯৯৭ সালের ব্রাজিলে কুরিতিবা শহরে এক সমাবেশ থেকে নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দিতে এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল সকালে ‘দখল ও দূষণমুক্ত করে নদীর জীবন বাঁচান, বাংলাদেশ বাঁচান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, জাতীয় নদী জোট ও জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলন।’ দেশের ৫০টি কর্মসূচি নদী আন্দোলনের অগ্রদূত সদ্য প্রয়াত বাপার সহসভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ স্মরণে উত্সর্গ করা হয়।

অনুষ্ঠানে জাতীয় নদী জোটের আহ্বায়ক শারমীন মুরশিদের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বাপার সভাপতি মানবাধিকার-কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বাপার কার্যনির্বাহী সহসভাপতি ডা. মো. আব্দুল মতিন। আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসের পটভূমি তুলে ধরেন ইন্টারন্যাশনাল রিভারর্সের কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও ওয়াটারকিপারস এলায়েন্সের পরিচালক শ্যারন খান। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল।

মানবাধিকার-কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সংবাদ সম্মেলনে জুমে যুক্ত হয়ে বলেন, প্রকৃতি ও সভ্যতা মানবজাতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে নদীর বিকল্প নেই। তিনি বলেন, নদী হচ্ছে দেশের সম্পদ। আর দেশের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের।

জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, দেশে নদী রক্ষার অনেক আইন আছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। নদী কমিশনকে নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

জাতীয় নদী জোটের আহ্বায়ক শারমীন মুরশিদ বলেন, আমাদের দেশে নদী রক্ষার চমত্কার আইন আছে তার পরেও কেন নদী রক্ষা করতে পারছি না। আমরা আন্দোলন করি, নদী কমিশন নদী উদ্ধার করে আবারও উদ্ধার করা নদীগুলো পুনর্দখল হয়ে যায়।