অণুগল্প

তূর্য ও বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২১, ২১:৩৯

 

সারা ঘরময় বঙ্গবন্ধু। যেদিকে চোখ যায় শুধু বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু। ছবি, বই, পোস্টার কী নেই? বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করা যেখানে যা দেখেছে তূর্য সেটা সংগ্রহ করে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে। যে কেউ দেখলে অবাক না হয়ে পারবে না। রুমে ঢুকে ডান দিকটায় একটা বিশাল ছবি। বক্তৃতারত অবস্থায় দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধু—বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এটা তূর্যকে উপহার দিয়েছেন। এভাবে বাঁ দিকটায় একটা ভাস্কর্য। সেটাও কোনো এক ভাস্করের কাছ থেকে নেয়া। তূর্যর বঙ্গবন্ধুপ্রীতি দেখে অনেকে তার জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন উপহার পাঠান। সেগুলোও সাজানো। রুমে ঢুকলে অন্যরকম ভালো লাগে। অবশ্য এখানে যে কেউ চাইলে ঢুকতে পারে না। রুমের কোনো কিছু যদি কেউ অনাদর করে। মাকে এ ব্যাপারে বলা আছে। এটা তূর্যর রুম। বলতে গেলে প্রায় সারা দিন কোনো না কোনো ভাবে এ ঘরে থাকে তূর্য। তার সমস্ত ভালোবাসা জমা হয়ে আছে এই এক ঘরে। শুধু বিকেলে ছোট সাইকেলটা নিয়ে একটু ঘুরপাক। তাও নির্দিষ্ট সীমানায়। বাবা থানার বড় বাবু। সরকারি চাকুরে। কিছুদিন পরপর বদলি। তূর্যরও গা সওয়া হয়ে গেছে। এবং বলতে দ্বিধা নেই বাবার বদলি তূর্যকে আরো আনন্দিত করে। বিভিন্ন জায়গায় বদলির সুবাদে ওর সংগ্রহ আরো সমৃদ্ধ হয়।

তার প্রিয়জন হচ্ছে মা। তাছাড়া আর একজন প্রিয় মানুষ হচ্ছেন ছোট কাকু। তাঁর কাছে তূর্যর আবদার হোক বায়না হোক সব। ছোট কাকুও তার সবকিছু আপনমনে মেনে নেন। মানবেনই বা কেন? তূর্যই পরিবারে একমাত্র সন্তান। তাই জন্মের পর থেকে ওকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন এই কাকু। কাকুর প্রাণ বলতেও তূর্য। তূর্যও কাকু ছাড়া কিছু বোঝে না। কাকু মাঝে মাঝে তূর্যকে নিয়ে সাইকেলে চেপে দূরে পাহাড়ের কাছাকাছি যায়। পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল বিল। যেখানে সাদা বকরা একপায়ে দাঁড়িয়ে। যে মাছের দেখা মিলবে, অমনি ঠোঁট দিয়ে ছোঁ মেরে ধরে নেবে মাছটাকে। এই দৃশ্য তূর্য অনেকবার দেখেছে। কাকুর বিলের ধারে নিয়ে যাবার কারণ, তূর্যর মনটাও যেন অনেক বড় হয়। মাঝে মাঝে তূর্য ফড়িং ধরার বায়না করে। কাকু একপা দুপা এগিয়ে ফড়িংয়ের কাছে নিয়ে যায়। তূর্য ফড়িংয়ের পিছে ধাওয়া করে। এ এক অন্যরকম আনন্দ তূর্যর।

কাকু আবার কখনো বড় পাহাড়ের কাছেও নিয়ে যায়। পাহাড়ের এ পাশটা বাংলাদেশ ও পাশটা ভারতের। সারা বছর পাহাড়ের কোণ বেয়ে ঝরনার পানি পড়ে। বর্ষায় পানি বেশি। অন্য সময় কম। সঙ্গে সাদা সাদা পাথরও। পাথর হাতে নিয়ে দেখে তূর্য। ধবধবে সাদা। কী নিখুঁত মসৃণ। একটা দুটো পাথর নিয়ে এসে জমা করে তূর্য। অনেকগুলো পাথর জমা হয়েছে। সাদা পাথরগুলোর দিকে তাকালে মন ভালো হয়ে যায় তূর্যর। তাই এই পাথরগুলোও কাউকে ধরতে দেয় না।

তূর্য এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে। স্কুলে সবাই ওকে চেনে। গত বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে, তূর্য সাতই মার্চের ভাষণ শুনিয়েছিল বন্ধুদের। স্কুলের মাঠটার এক কোণায় একটা স্টেজ বানানো হয়েছিল। স্টেজের সামনে শিক্ষকরা বসা। পেছনে ছাত্ররা দাঁড়িয়ে। তূর্য স্টেজে উঠে নাগাড়ে বঙ্গবন্ধুর আদলে আঙুল উঁচিয়ে সাতই মার্চের বক্তৃতা হুবহু বলে যায়। একবারও থামে না। পিনপতন নীরবতা। সবাই অবাক। ও যে ছোট এটা কারো মনে আসেনি। বক্তৃতা শেষে তুমুল করতালি। তালি থামতেই চায় না। সেই থেকে তূর্য স্কুলে খুব পরিচিত মুখ।

স্কুলে এখন সবাই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসে। ওদের কাছে তূর্য হিরো—তূর্য এটা অনুভব করে। সবাইকে সে বঙ্গবন্ধুর গল্প বলে। বঙ্গবন্ধু ছোটদের খুব ভালোবাসতেন। ছোটরা যেন বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে সেজন্য তূর্যর প্রচেষ্টা।

তূর্যর এই স্বভাব আপনাআপনি আসেনি। গোড়ার কথা বলতে গেলে ওর দাদা। দাদা ছিলেন প্রচণ্ড বঙ্গবন্ধু ভক্ত। পরীক্ষা শেষে প্রতিবছর গ্রামের বাড়িতে যাওয়া পড়ে তূর্যদের। দাদু তাকে কোলে করে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন জনসভায়। দাদু রাজনীতি করতেন। যেখানে দাদুর বক্তৃতার সিংহভাগ জুড়েই থাকত বঙ্গবন্ধুর কথা। তাঁর আদর্শের কথা। এভাবে তূর্য কবে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে তার মনে জায়গা করে নিয়েছে টেরই পায়নি। দাদুর একটা স্বভাব নিয়ে তূর্যকে এখনো ভাবায়। কেউ বঙ্গবন্ধুকে ভালো না বাসলে সে বাড়িতে পা-ই মাড়াতেন না দাদু। যদি আত্মীয়ও হন। এমনকি অন্য কোনো দলের তোড়নের নিচ দিয়ে পা পড়ত না দাদুর। দাদু বঙ্গবন্ধুকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তূর্যরও মাঝে মাঝে দাদু হতে ইচ্ছে করে।