মওদুদ আহমদ আর নেই

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ২২:২১

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি, প্রখ্যাত আইনজীবী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। উন্নত চিকিত্সার জন্য গত ২ ফেব্রুয়ারি মওদুদ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি হন।

রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস ও বুকে ব্যথা অনুভব করলে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ব্যারিস্টার মওদুদকে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হার্টে ব্লক ধরা পড়ায় তার হূদ্যন্ত্রে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়।

২০ জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়া হয়। এরপর আবার ২১ জানুয়ারি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। এরপর ১০ মার্চ সেখানে ফুসফুসে পানি জমে অক্সিজেন গ্রহণক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি কিডনি জটিলতায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।

শোক

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন রাষ্ট্রপতি।

মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন প্রমুখ।

জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম শোকবাণীতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৯৪০ সালের ২৪ মে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মাওলানা মমতাজ উদ্দিন আহমদ এবং মা বেগম আম্বিয়া খাতুন।

শিক্ষাজীবনে মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান পাশ করে লন্ডনের লিংকন্স ইন থেকে অর্জন করেন বার-অ্যাট-ল। দেশে ফিরে হাইকোর্টে ওকালতির একপর্যায়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন আইনি লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আইনি লড়াই করতে খ্যাতনামা ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার টমাস উইলিয়ামস কিউসিকে বাংলাদেশে আনতে রেখেছিলেন ভূমিকা। ১৯৭১-এ ইয়াহিয়া খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন তিনি। বিএনপি গঠনেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করার পর বিশেষ সামরিক আদালতে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন এই রাজনীতিক। ১৯৮৫ সালে সেই দণ্ড মাথায় নিয়েই এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হন মওদুদ আহমদ।

এরশাদের ক্ষমতাত্যাগের পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পার্টিতে ছিলেন। এর পরপরই ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা’র মতোই বিএনপিতে ফিরে আসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তিনি আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাঁচ বার মওদুদ আহমদ নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হন।

মওদুদ আহমদ রচনা করেছেন এক ডজনের বেশি বই। রাজনৈতিক ও লেখক ছাড়াও বিদেশের বিখ্যাত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। 

মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ হলেন পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের কন্যা। হাসনা মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং তিনিও এরশাদ সরকারের সময় সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হয়েছিলেন। এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। দুই ছেলেই মারা গেছেন। মেয়ে আনা আসপিয়া মওদুদ স্বামীসহ থাকেন নরওয়েতে।