আমাদের ব্যাচেলর জীবনে রাজার মতো দিন কেটেছিল ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারে। এই বাসায় পরিপূর্ণ বারান্দা ছিল। জুতা রাখার জায়গা ছিল। চারপাশে গাছগাছালি, দুটো টয়লেট, একটি রান্নাঘর ছিল। আর ছিল চারদিকে ফাঁকা জায়গা। অবশ্য বাসাটা নিচতলা হওয়ার কারণে চোরের উত্পাত এতটাই বেশি ছিল যে, বাসায় সব সময়ই লুঙ্গির ঘাটতি থাকত।
এই বাড়িতে আমরা প্রথমবারের মতো একজন কন্যাদায়গ্রস্ত বাড়িওয়ালা আঙ্কেল পেলাম। ঢাকাই বাড়িওয়ালা। বিবাহযোগ্যা কন্যার পিতা আমাদের আঙ্কেল! আমরা আঙ্কেলকে বড়ই আপন, নিকট আত্মীয় হিসেবে জ্ঞান করতে শুরু করলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই আমাদের মন ভেঙে খান খান! আমাদের বুয়া জানাল যে, বাড়িওয়ালার মেয়ে কিছুদিন আগে এই বাড়ির এক ভাড়াটিয়ার সঙ্গে ভেগে গিয়েছিল। সপ্তাহখানেক বৈবাহিকজীবন অতিবাহিত করে কন্যা তার পিত্রালয়ে প্রত্যাগমন করেন।
স্বপ্নের রাজকন্যার এহেন জীবন বৃত্তান্ত জেনে আমাদের ব্যাচেলর হূদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমি নির্দোষভাবে বাড়িওয়ালাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতে শুরু করলাম।
কয়েকদিন পর হঠাত্ বাসার চারদিকে পরিষ্কার করা শুরু হলো। কিছু একটা হচ্ছে ধারণা করে বুয়াকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন—বাড়িওয়ালার মেয়ে যার সঙ্গে পালিয়েছিল, সেই মজনুর সঙ্গেই বিয়ে! বাড়িতেই অনুষ্ঠান হবে, খাওয়াদাওয়া হবে।
খাওয়াদাওয়া! আহা কতদিন ভালোমন্দ খাই না। দিন কেটে যায়, বিবাহের দিন ঘনিয়ে আসে, বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখাও হয়, কিন্তু সালাম বিনিময় ছাড়া অন্য আলাপে তিনি যান না। তবে কি আমরা দাওয়াত পাব না? বাড়ির চৌহদ্দিতে পোলাও-মাংস রান্না হবে, মানুষজন খেয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে যাবে, আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব, এই ছিল আমাদের কপালে?
বিধাতা আমাদের কষ্ট বুঝলেন। এক সন্ধ্যায় বাড়িওয়ালা আমাদের দরজায় কড়া নাড়লেন, আগামী শুক্রবার তার কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠান। দুপুরে আমাদের সকলের দাওয়াত। মনটা আনন্দে ভরে গেল। আহা পোলাও-মাংস! শেষমেষ ধরা দিলি রে বাবা।
শুক্রবার সকালে হৈচৈ শুনে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই শুনি—বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য যে আঠাশটি মুরগি কেনা হয়েছিল সেখান থেকে দশ-বারোটি ছুটে গেছে। ছুটে যাওয়া মুরগিগুলো বাউন্ডারির মধ্যে মহাআনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িওয়ালা সেগুলো ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমাদের দেখে উদ্বিগ্ন নয়নে মুরগি ধরার কাজে সাহায্য করতে বললেন। আমরা ছুটে যাওয়া মুরগিগুলোর মধ্যে আমাদের জন্য বরাদ্দ রোস্টের ছবি দেখতে পেলাম। এগুলো ধরতে না পারলে যেন নিজেদের ভাগ্যের রোস্ট অনিশ্চিত হয়ে যাবে! মুহূর্তেই আমরা লুঙ্গি কাছা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেক ঝাঁপাঝাঁপির পরেও ছয় কি সাতটি মুরগি পাকড়াও করা সম্ভব হলো। কয়েকটি মুরগি আমাদের হূদয় ছিন্ন করে দেয়াল পেরিয়ে পালাল। সকাল সকাল মন খারাপ হয়ে গেল। এই কিপটে বাড়িওয়ালা নিশ্চয়ই মাথাগুনে মুরগি কিনেছে। এখন যদি আমাদের কপাল থেকে রোস্ট বাদ যায়!
দুপুর সন্নিকটে। দাওয়াতি মেহমানরা আসতে শুরু করেছে দেখে আমরাও রেডি হতে থাকলাম। পাশের একটি রুমে বিয়ের কনে সেজেগুজে বসে আছে। আমরা খেতে বসে গেলাম। আমাদের আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে প্লেটে চলে এল কাঙ্ক্ষিত মুরগির রোস্ট! আহা! আজকের দিনটা কী সুন্দর!
আমাদের খাওয়াদাওয়া প্রায় শেষ মুহূর্তে, দ্বিতীয়বার পোলাও নিচ্ছি, এমন সময় কনের ঘর থেকে হুড়োহুড়ি আর কান্নার শব্দ। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে বুঝতে পারলাম, কিন্তু খাওয়া থামালাম না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে জানলাম যে, বিয়ের আসরেই কনের প্রসব ব্যথা উঠেছে। মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
আমরা তো শুনে অবাক! আজকের খাওয়ার উপলক্ষ তাহলে ডাবল—বিয়ে প্লাস বাচ্চা!
