মানিকপুরে পিতা-মাতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত মওদুদ আহমদ

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ২২:৪৫

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রখ্যাত আইনজীবী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীর বসুরহাটের গ্রামের বাড়ি মানিকপুরে পিতা-মাতার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে। ঢাকা ও কোম্পানীগঞ্জে পাঁচ দফা জানাজা ও সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিলেন তিনি। কবিরহাট কলেজ মাঠ, বসুরহাট সরকারি কলেজ মাঠ ও মানিকপুরে নিজ বাড়ির সামনে তিন দফা জানাজা শেষে বাদ মাগরিব সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা মাওলানা মমতাজ উদ্দিন আহমদ ও মা আম্বিয়া খাতুনের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা :এর আগে শুক্রবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মওদুদ আহমদের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে রাখা হয়। সেখানে বিএনপি, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), এনডিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ মওদুদ আহমদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানায়। পরে সকাল পৌনে ১০টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মওদুদ আহমদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা পৌনে ১১টার দিকে মওদুদ আহমেদের মরদেহ নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আনা হলে এক শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেখানেই তাকে শেষ শ্রদ্ধা ও বিদায় জানান নেতাকর্মীরা। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে মওদুদ আহমদের মরদেহ নেওয়া হয় তার জন্মভিটা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানিকপুরে। দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে তার মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারটি কবিরহাট সরকারি কলেজ মাঠে অবতরণ করে। তার নির্বাচনি এলাকা নোয়াখালী-৫-এ (কবিরহাট-কোম্পানীগঞ্জ)  জনগণের মাঝে মাতম চলছে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে স্বামীর কফিনের পাশে বসে ছিলেন শোকগ্রস্ত হাসনা মওদুদ। মওদুদের ভায়রা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন শহিদ মিনারে।

শহিদ মিনারে মওদুদ আহমদের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, তৈমূর আলম খন্দকার, অধ্যাপক মামুন আহমেদ, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক আহমেদ খান, যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ছাত্রদলের ফজলুল রহমান খোকন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির বেলায়েত হোসেন, গণফোরামের মোশতাক আহমেদ, জাগপার খোন্দকার লুতফর রহমান, ন্যাপের গোলাম মোস্তফাসহ বিভিন্ন সংগঠন। এছাড়া জাসাস, মুক্তিযোদ্ধা দল, ড্যাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয় নেতার কফিনে। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে মওদুদ আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি নুরুজ্জামান, বিচারপতি সৈয়দ জিয়াউল করিম, বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান, মত্স ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক দুই সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন ও বশির আহমেদ। এ ছাড়া বিএনপি নেতাদের মধ্যে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতি ফোরাম, মওদুদ আহমদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস, ল রিপোর্টার্স ফোরাম এবং ফেনী-নোয়াখালী আইনজীবী ফোরাম শ্রদ্ধা জানায়।

নয়া পল্টনে মানুষের ঢল : বেলা ১১টায় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে প্রখ্যাত এই আইনজীবীর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা পৌনো ১১টায় তার লাশ নিয়ে আসা হয় নয়া পল্টন কার্যালয়ের সামনে। জানাজায় দলটির নেতাকর্মীদের ঢল নামে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে মরহুম নেতার কফিন দলীয় পতাকায় ঢেকে দেন। পরে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মির্জা ফখরুলসহ সিনিয়র নেতারা। এরপর দলের অন্য নেতা ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতারা এই নেতার মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানাজায় অংশ নেন। এ সময় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নজরুল ইসলাম খান, শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, তাবিথ আউয়াল, ইশরাক হোসেন, দেওয়ান সালাউদ্দিন, যুবদলের সাইফুল আলম নীরব প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন। অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল হালিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শেষ যাত্রা মানিকপুরে :জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য দুপুরের পর থেকেই কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও বসুরহাট সরকারি মুজিব কলেজ মাঠে জনসমাগম বাড়তে থাকে। দুপুর ৩টায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় কবিরহাট সরকারি কলেজ মাঠ। সেখানে তার তৃতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি মুজিব কলেজ মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে নিজ বাড়ির দরজায় এই রাজনীতিককে এলাকার সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় দাফন করা হয়। জানাজায় অংশ নেন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি, কবিরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জাসহ দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণ। অন্যদিকে মুজিব কলেজ মাঠে জানাজায় অংশ নেন বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু প্রমুখ। এ সময় মরহুমের জন্য দোয়া চান তার স্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য হাসনা জসীমউদদীন মওদুদ।

মওদুদ স্মরণে কাদের মির্জার তোরণ :মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে বসুরহাটে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেন সেতুমন্ত্রীর ছোট ভাই ও বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। পাশাপাশি বসুরহাট পৌর ভবন সংলগ্ন প্রধান সড়কে মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে একটি তোরণ নির্মাণ করেন কাদের মির্জা।