যমুনা অয়েল কোম্পানির দেড় লাখ লিটার তেল লোপাটের অভিযোগের সুরাহা হয়নি তিন বছরেও। একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, যমুনা অয়েল কোম্পানির বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও পুরো বিষয়টি ঝুলে আছে। এমনকি বিভাগীয় তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টে ছয় জনকে অভিযুক্ত করা হলেও প্রথমে যে তিন জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল তারা ছাড়া বাদবাকি তিন জন চাকরিতে বহাল রয়েছেন। এতে করে তিন জন চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী অর্ধেক বেতন পাচ্ছেন। কিন্তু বাকি তিন জন যথারীতি চাকরিতে থেকে পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না করে তিন জন অর্ধেক বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। আবার বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টে অভিযুক্ত হওয়ার পরও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অন্য তিন জন পূর্ণ সুবিধা ভোগ করছেন। এ নিয়ে অভিযুক্তদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন বলে জানা যায়। এমনকি তদন্তে অভিযুক্তদের একজনকে এই সময়ে একাধিক ইনক্রিমেন্ট পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এক্ষেত্রে যমুনা অয়েল কোম্পানির বিশাল অংকের অর্থেরও সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।
২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর যমুনা অয়েলের গুপ্তখাল ডিপো থেকে এমটি রাইদা ও এমটি মনোয়ারা নামের দুটি জাহাজে তেল পাচারের অভিযোগ ওঠে। পরে ঐ বছরের ৫ নভেম্বর খুলনার খালিশাপুর এলাকার ভৈরব নদীতে তেল বিক্রির অভিযোগে রাইদা নামক ট্যাংকার আটক করে র্যাব-৬। ঐ সময় ট্যাংকারে থাকা ১৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর খুলনার দীঘলিয়া থানায় মামলা করে র্যাব-৬। ঐ মামলায় যমুনা অয়েলের এজিএম (টার্মিনাল) নুরুদ্দিন আহমেদ আল মাসুদ, সহকারী ম্যানেজার (অপারেশন) প্রিয়তোষ নন্দীকেও আসামি করা হয়। পরের দিন ৮ নভেম্বর যমুনা অয়েল কোম্পানি নুরুদ্দিন আহমেদ আল মাসুদসহ তিন জনকে সাময়িক বরখাস্ত করে। ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি খুলনা আদালত থেকে উপরোক্ত কর্মকর্তাগণ খালাস পান। যথারীতি তারা ৮ জানুয়ারি যমুনা অয়েল কোম্পানিতে তাদের কর্মস্থলে যোগদানের আবেদন করেন। কিন্তু যমুনা অয়েল কোম্পানি ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি প্রাথমিক তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত তিন জনসহ পাঁচ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে এবং তাদের এ বিষয়ে জবাব দিতে বলে। এরপর যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিজিএম মাসুদ করিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি অভিযুক্ত পাঁচ জনের মধ্যে গোলাম কিবরিয়ার সম্পৃক্ততা না পেয়ে তাকে মামলা থেকে বাদ দেয়। তবে জাহেদ মুরাদ ও নুরুল আলম নামক দুই কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে পাঁচ মাস পর ২০১৮ সালের ৩ জুলাই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে যমুনা অয়েল কোম্পানি ক্ষতির দায় নির্ধারণে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটি অভিযুক্ত ছয় জনের মধ্যে পাঁচ জনের ওপর বিভিন্ন পরিমাণ দায় নির্ধারণ করে। এরপর ২০১৯ সালের মে মাসে নুরুদ্দিন আহমেদ আল মাসুদ উচ্চ আদালতে এর বিরুদ্ধে মামলা করেন। উচ্চ আদালত দুই মাসের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য যমুনা অয়েল কোম্পানিকে নির্দেশ দেয়। উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নুরুদ্দিন আহমেদ আল মাসুদ ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পুনরায় তার কর্মস্থলে যোগদানের জন্য যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। বিষয়টি যমুনা অয়েল কোম্পানির বোর্ড সভায় ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর উত্থাপন করা হলে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তা নিষ্পত্তি করতে বলা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিয়াস উদ্দিন আনসারির কাছে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে যমুনা অয়েলের
সাবেক এজিএমের অবস্থান ব্যাখ্যা
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক এজিএম (টার্মিনাল) নুরুদ্দীন আহমেদ আল মাসুদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম শফিউর রহমান। লিখিত ব্যাখ্যায় তিনি উল্লেখ করেন, আমার মক্কেল তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে আদালত কর্তৃক অব্যাহতি লাভ করেছেন। সুতরাং চাকরিতে যোগদানের বিষয়টি তার মৌলিক অধিকার। ব্যারিস্টার এইচ এম শফিউর রহমান আরো উল্লেখ করেন, মামলা থেকে অব্যাহতি লাভের পর ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি আমার মক্কেল যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চাকরিতে যোগদানের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু ঐ আবেদনে সাড়া না দিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আমার মক্কেল একই আবেদন জানিয়ে ১৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় বার, ১৬ এপ্রিল তৃতীয় বার, ১৬ মে চতুর্থ বার এবং ২৪ সেপ্টেম্বর পঞ্চম বার আবেদন করেন। উক্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল মূলত আমার মক্কেলকে হয়রানি ও তার ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য।
