ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে কেন আরব দেশগুলো

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২১:০৫

 

ইসরাইলের সঙ্গে সম্প্রতি কয়েকটি আরব দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ইহুদিবাদী দেশটির সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এখন হালের নতুন ট্রেন্ড। অথচ ফিলিস্তিন ইস্যুটির কোনো সুরাহা হয়নি। ইসরাইল এখনো চায় না ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের অধিকারী হোক। এরই মধ্যে ২০২০ সালে এক বছরের মধ্যে চারটি আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে।

ফিলিস্তিনি ইস্যুকে কেন্দ্র করেই ইসরাইলকে এত দিন একঘরে করে রেখেছিল আরব দেশগুলো। সর্বপ্রথম মিশর ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের দুয়ার খোলে। এর পরের বছর দেশ দুটির মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। ১৯৭৩ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়, যার কারণে সিনাই উপত্যকা হাতছাড়া হয়। ক্যাম্পডেভিড চুক্তি মিশরের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ও ডানপন্থি লিকুদ দলের প্রতিষ্ঠাতা মেনাহাম বেগিনকে যৌথভাবে নোবেলে শান্তি পুরস্কার এনে দেয়। এর অনেক বছর পর ১৯৯৪ সালে ইসরাইল ও জর্দানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করার মূল্য সাদাতকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। সাদাতের পর কোনো আরব নেতাকে অবশ্য এ রকম ভাগ্য বরণ করতে হয়নি।

ইসরাইলের সঙ্গে এ পর্যন্ত যেসব আরব দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ককে সবচেয়ে উষ্ণ বলা যায়। মিশর ও জর্দানের সঙ্গে স্থাপিত পুরোনো সম্পর্কও এতটা জোরালো মনে হয়নি। গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়ার পর ইসরাইল থেকে হাজার হাজার পর্যটক আবুধাবিতে গেছে। অন্যদিকে ইসরাইলি ফুটবল টিমের একটি স্পনসরশিপ কিনেছেন আমিরাতের রাজপরিবারের একজন সদস্য। ইসরাইলে কোনো একজন আরব নাগরিকের এটিই এযাবত্কালের সর্ববৃহত্ বিনিয়োগ।

ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে দেখলে এটি তাদের দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি একটি বিশ্বাসঘাতকতা। এ যেন তাদের বিষাদময় ইতিহাসে যুক্ত করেছে আরেক ট্র্যাজিডি। ফিলিস্তিনিরা আরব-ইসরাইল সম্পর্ক তখনই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে, যখন পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে পারবে। তারা একই সময়ে হতাশার সঙ্গে লক্ষ করেছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে এনেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি স্থাপনকে বৈধ বলে মেনে নেয়। যদিও অধিকৃত কোনো ভূখণ্ডে কোনো রকম বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত নয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের এসব কর্মকাণ্ডের জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যে খুব চেষ্টা-তদবির করেছেন তা-ও নয়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ইসরাইলকে যতটা এগিয়ে দিয়েছে, ততটা পিছিয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার একটি কারণ হলো ইসরাইল-আমিরাত সংলাপ শুরুর নেপথ্যের কারিগর হিসেবে সাবেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মোহাম্মদ দাহলানের নাম এসেছে।

দাহলান গাজার সাবেক প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। ফিলিস্তিন কর্তৃক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের একজন কট্টর বিরোধী হওয়ায় তিনি প্রায় এক দশক আগে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হন। দেশান্তরী অবস্থায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে আবুধাবি তার ঠিকানা। তিনি ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন যায়েদ আল নাহিয়ানের একজন উপদেষ্টা।

ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে তা হবে একটি অগ্রগতি। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ কেনেথ পোলাক মনে করেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, এর ফলে ইরান ও হিজবুল্লাহর মতো বৈরী শক্তিগুলো আরো হতাশ। পরিস্থিতি তাদের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি বিষয়টিকে ১৯০৭ সালে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত অ্যাংলো রাশিয়ান কনভেনশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ধারণা করা হয়, ঐ সমঝোতা প্রায় এক দশক পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সুদান সফরকালে তিনি প্রস্তাব দেন, যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসবাদে স্পনসর দেশগুলোর তালিকা থেকে বাদ দেবে। তবে শর্ত হলো, ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জুড়তে হবে। এর আগে ডিসেম্বরে ওয়াশিংটন খার্তুমকে প্রাথমিকভাবে সন্ত্রাসে সহযোগিতাকারীর কালো তালিকা থেকে বাদ দেয়। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে ঐ তালিকায় নিয়েছিল।