কতটুকু লাভবান হচ্ছে পাকিস্তান?

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২১, ২১:০৬

 

চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা পাকিস্তানকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছে। জনবিক্ষোভ, বিশাল অঙ্কের ঋণ, টলায়মান রিজার্ভ এখন সেখানকার অবস্থা। এসব সত্ত্বেও অবস্থা পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন মনে করছে না দেশটি।

২০১৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার নেয়। চায়না-পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের অংশ হিসেবে পাকিস্তান এ অর্থ পায়। ইসলামাবাদের নীতি-নির্ধারণীমহল দীর্ঘমেয়াদি এর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে তখন ধারণা করতে পারেনি। সিপিইসি চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অবকাঠামো প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ। ধারণা করা হয়েছিল, এর ফলে দুই দেশই উপকৃত হবে। আর্থিক সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্রদের থেকেও পাকিস্তান তখন দূরে ছিটকে পড়েছিল। অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ইস্যু ছাড়াও অভিন্ন প্রতিপক্ষ ভারতকে সামনে রেখে বেইজিং-ইসলামাবাদ পরস্পরের কাছাকাছি আসে। ভারতের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী প্রয়োজন। এদিক দিয়ে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের অর্থে পাকিস্তান প্রথমে বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত শুরু করে। ধারণা করা হয়, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে পাকিস্তানে জনসমর্থন আছে। এ কারণে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক বিষয়টি নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। তবে এই সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ নয়। সুবিধার পাল্লা পুরোটাই ঝুঁকে আছে চীনের দিকে। জেট ফাইটার থেকে করোনা ভ্যাকসিন, সব ব্যাপারেই ইসলামাবাদ এখন তাকিয়ে আছে বেইজিংয়ের দিকে। জানুয়ারিতে চীনের সাইনোফার্ম কোম্পানি উপহার হিসেবে পাকিস্তানকে ৫ লাখ ডোজ টিকা উপহার দেয়।

বেইজিংয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার বিষয় ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদকে সতর্ক করে দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র সম্প্রতি বলেন, সিপিইসি প্রকল্পে স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে। এর ফলে সীমাহীন ঋণে ডুবে যেতে পারে পাকিস্তান। চীনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এর থেকে এক তরফাভাবে লাভবান হবে। বিষয়টি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ তা নয়, পাকিস্তানেরও অনেকে এখন এ নিয়ে উত্কণ্ঠিত। তারা মনে করেন, চীনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার ফলে পাকিস্তানের সম্পদ যেমন বাইরে চলে যাচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাদের সুনামহানি ঘটছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে ব্লুমবার্গে প্রকাশিত নিবন্ধে জানা যায়, পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে গত তিন বছরে (২০১৮ থেকে ২০২০) মোট ১১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে আইএমএফ থেকে পেয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছর মহামারি চলাকালে মঞ্জুর করা হয়। বেশি অর্থ এসেছে চীনের কাছ থেকে। এভাবে চীনের ঋণের জালে আটকা পড়ছে দক্ষিণ এশীয় দেশটি। পাশাপাশি বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মান অবনমন।

‘এটি একটি ফাঁদ কিন্তু এ ফাঁদে তারা স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে’ বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হোসেইন হাক্কানি। তিনি বর্তমানে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হাডসন ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া শাখার পরিচালক। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে পাকিস্তান যে বিশাল ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে যাবে পশ্চিমা দেশগুলো সেটি আগেই ধারণা করেছিল।

হাক্কানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা আইএমএফ কখনো ঋণ দিয়ে কোনো দেশের ভূখণ্ডের ওপর অধিকার দাবি করে না, কিন্তু এ কাজটি চীন করেছে। উদাহরণ স্বরূপ তিনি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের কথা বলেন। চীনের অর্থায়নে বন্দরটি নির্মিত হয়। শ্রীলঙ্কা ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে অসমর্থ হলে বেইজিং বন্দরটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তার কথায়, পশ্চিমা দেশগুলো হিসাব করে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঋণ দেয়, চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সে রকম নয়। এখানে স্বচ্ছতার অভাব আছে।

বিশেষজ্ঞরা, পাকিস্তানের গাওয়াদার বন্দরের বিষয়ে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ইরান সীমান্তের কাছে চীনের সহায়তায় তৈরি ঐ বন্দরের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিও হাম্বানটোটার ভাগ্য বরণ করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। এর নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিবাদ হয়েছে। এখানে ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর চেয়ে বড় কারণ যে, এর ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়েনি। কারণ চীন শ্রমের জন্য স্থানীয় জনশক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজের দেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে বেইজিং অথবা ইসলামাবাদ কোনো তরফে প্রতিক্রিয়া জানান হয়নি। হাক্কানি মনে করেন, যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হলে সেটি চীনা পণ্য পাকিস্তানের বাজারে বিক্রি করতে সুবিধা হবে। পাকিস্তানের পালটা সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললে চলে।