বারংবার তাগাদা দিবার পরও শহরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বেশিরভাগই শহরের বাহিরে তাহাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতেছে না। কোনো কোনোটি নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে পারে নাই, কোনোটি আবার স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিলেও শহরের ক্যাম্পাসটি ছাড়িতেছে না। ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের পর হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার জন্য ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তত পাঁচ বার সময় দেয় সরকার। কিন্তু খুব বেশি ফল আসে নাই। ইতোমধ্যে মাত্র ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়াছে। বাকি ৩১টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে গড়িমসি করিতেছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। জানা গিয়াছে, শিক্ষার্থী হারাইবার আশঙ্কা হইতে তাহারা এমন আচরণ করিতেছে। যাহারা শহরের প্রান্তসীমায় নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহারা রক্ষা পাইলেও, কাহারও কাহারও নিজস্ব জমি পড়িয়াছে আশুলিয়া কিংবা সাভারের মতো স্থানে। ফলে দেখা যাইতেছে, তাহারা ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিলেও নগরে অবস্থিত পুরানা ভবনেই প্রধানত কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানাইয়াছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় হইতেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হয়। আইন পাস হইবার পর একই বছর ‘রেড অ্যালার্ট জারি’ করিয়া ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার সময় বাঁধিয়া দেওয়া হয়। এইভাবে বারবার সময় বাঁধিয়া দিবার পরও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে ব্যর্থ হইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি।
নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিবার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানরক্ষার প্রতিশ্রুতির সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। যেকোনো দালান খাড়া করাইয়া বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিয়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম মান কিছুতেই অর্জন সম্ভব নহে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাব-সুবিধা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, মিলনায়তন, মাঠ এবং যথেষ্ট উন্মুক্ত পরিসর। গুণী-মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়া, সেইরকম আদর্শ ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে পারিলে, উপরন্তু ছাত্রাবাসের সুবিধা প্রদান করিতে পারিলে শিক্ষার্থীর অভাব হইবে না, যাহাদের অপেক্ষাকৃত উচ্চ বেতনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইতে পারে। কারণ জনবহুল দেশ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা লইবার জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে, অনেকেই মানসম্পন্ন পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় চাহিয়াও পাইতেছে না। চটকদার কার্যক্রম দিয়া দ্রুত কিছু শিক্ষার্থী সংগ্রহ করিয়া দ্রুত মুনাফা অর্জন খারাপ নীতি। বরং ধীরে ধীরে একটি মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার কৃতিত্ব অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। মুনাফার বিষয়টি তখন আপনাআপনি হাজির হইবে। নূতন-পুরাতন মিলাইয়া প্রায় চার লক্ষ শিক্ষার্থী এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধ্যয়ন করিতেছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বাংলাদেশে অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা হিসাবে উপস্থিত রহিয়াছে। এখন সময় হইয়াছে এই প্রতিষ্ঠানগুলির ন্যূনতম মান অর্জনের। ইহার অন্যতম পূর্বশর্ত হইল—ভৌত অবকাঠামো সুনিশ্চিত করা। ছড়ানো ছিটানো ভাড়া করা দালানঘরের পরিবর্তে নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণই হইতে পারে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক একটি ধাপ। প্রশ্ন হইল, নিয়ম অনুসরণ না করিলে তাহার শাস্তি কী? চট করিয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করিয়া দেওয়া যায় না, কারণ ইহার সহিত শত শত কিংবা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য জড়িত থাকে। ফলে বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। এইক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে যেমন দায়িত্বশীল আচরণ করিতে হইবে, তেমনি মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) এমন শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে যেন তাহারা শহরের উপর চাপ কমাইয়া স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে বাধ্য হয়।
