নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি সমীক্ষা

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫১

দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন শেষে নতুন মন্ত্রিসভাও কার্যভার গ্রহণ করেছে। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এখনো শেষ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মন্ত্রিসভায় পুরনো মন্ত্রিদের ব্যাপকভাবে বাদ দিয়ে তাক সৃষ্টি করেছেন বটে, কিন্তু তার উপদেষ্টা পরিষদে কোনো নতুন মুখ গ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলেছি, দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দেশের মানুষ শেখ হাসিনাকে দিয়েছে, তিনিই ঠিক করবেন, তার উপযুক্ত পরামর্শদাতা কারা? এই ব্যাপারে আমাদের কারোর মাথা ঘামাবার কিছু নেই।

মুখে একথা বলেছি বটে, কিন্তু মনে মনে আশা করেছিলাম, আগামী দিনের আরও বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য শেখ হাসিনা তার উপদেষ্টা পরিষদেও নতুন মুখের সংযোগ ঘটাবেন। অর্থ, তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক আধুনিক চিন্তাচেতনার অধিকারী পরামর্শদাতা স্থান পাবেন উপদেষ্টা পরিষদে। তাদের কারো কারো নামও ভেবে রেখেছিলাম। প্রবীণ সাংবাদিক এবং বঙ্গবন্ধুর তথ্য ও গণসংযোগ সচিব তোয়াব খান অথবা তার মতো কাউকে উপদেষ্টা পরিষদে দেখতে চেয়েছি। বঙ্গবন্ধুও তাকে একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে এনে তার গণসংযোগ সচিব করেছিলেন।

আমার এ আশা পূর্ণ হয়নি বটে, কিন্তু ভবিষ্যতে পূর্ণ হবে না— এমন কথা বলতে পারি না। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদ সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শেখ হাসিনার বর্তমান মন্ত্রিসভায় পুরনো ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি দেখেও প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিলাম। সম্প্রতি কয়েকজন নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে সেই ভয় দূর হয়েছে। শেখ হাসিনার একটা বড় গুণ এই যে, তিনি নতুন ট্যালেন্ট বাছাই ও সংগ্রহে পারদর্শী।

সম্প্রতি লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের বিদূষী হাইকমিশনার সাইদা মুন্নার বাসভবনে ঘরোয়া ভোজসভায় ভূমিমন্ত্রী জাভেদ চৌধুরীর সঙ্গে (চট্টগ্রামের প্রয়াত আখতারুজ্জামান (বাবু) চৌধুরীর পুত্র) দেখা। তিনি বয়সে তরুণ। নতুন মন্ত্রী নন। আগের মন্ত্রিসভায় ভূমি দফতরের স্টেট মন্ত্রী ছিলেন। এখন পূর্ণ মন্ত্রী। দেশের ভূমি সমস্যা সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং তার সমাধান সম্পর্কে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা জেনে বিস্মিত হলাম। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। কিন্তু ভূমি সমস্যা সম্পর্কেও তিনি সমানভাবে অভিজ্ঞ।

আরও কয়েকজন নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে আমার মনে হয়েছে, এদের চিন্তা-চেতনা আগের অনেক মন্ত্রীর মতো গতানুগতিক নয়। তারা বয়সে তরুণ, কিন্তু চিন্তা-চেতনায় অনেকেই আধুনিক এবং সমস্যা সমাধানে আধুনিক যুগের কার্যপ্রণালীর সঙ্গে পরিচিত। সবচাইতে বড় কথা, দলের বিরাট নির্বাচনী জয়ে তাদের অধিকাংশের মাথা গরম হয়নি। বরং এই জয় তাদের জন্য যে বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং সেই চ্যালেঞ্জ সার্থকভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে এই দল এবং সরকারের কী পরিণতি ঘটবে সে সম্পর্কে তাদের অধিকাংশই সচেতন।

আমার আশা, মন্ত্রিসভা গঠনে শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে যে চমক দিয়েছেন, সেই চমক দল পুনর্গঠনেও দেবেন। আওয়ামী লীগকে জনগণের দল হিসেবে পুনর্গঠিত করতে হলে এর খোলনলচে আমূল পরিবর্তন করা দরকার। দল সংগঠিত ও শক্তিশালী না হলে কোনো রাজনৈতিক সরকার দীর্ঘকাল জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে পারে না। আওয়ামী লীগে তৃণমূলের নেতা ও কর্মীদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। অনুপ্রবেশকারী নব্য ধনীদের এক বিরাট অসাধু অংশের কব্জা থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে। নইলে ভারতের কংগ্রেসের পরিণতি ঘটবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের। বর্তমান নির্বাচনের সাফল্য বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না। ভাঙা কাচে পা কাটা যাবে।

নির্বাচনোত্তর বিএনপি (দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল) সম্পর্কে বলা চলে, এই বিশাল পরাজয়ের ধাক্কা থেকে দলটি তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে না, যদি সে তার নীতি ও নেতৃত্ব না বদলায়। দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী তারেক রহমান দেশের নির্বাচন শেষে লন্ডনে সভা ডেকে আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করেছে এবং আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতের দল বলে প্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে নিজে হাওয়া ভবনের ‘ডাকাত সর্দার’ এবং সেই কারণে এবারেও দেশে ফিরে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিতে সাহস পাননি তা তার বক্তৃতায় চেপে গেছেন। কিন্তু দেশের মানুষ তার আসল চেহারা ভুলে গেছে কি?

বিএনপি’র নীতি ও নেতৃত্ব যে জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত একথা জেনেই এবার দলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় র্যাঙ্কের নেতারা বিপরীত মতের শিবির থেকে কিছু বিতর্কিত নেতা ‘হায়ার’ করে এনে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আশা করেছিলেন। তাদের এই আশা পূর্ণ হয়নি। বরং তা তাদের বিশাল পরাজয়ের একটি বড় কারণ হয়েছে। এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি যদি তার বর্তমান নীতি ও নেতৃত্ব না বদলায় তাহলে আগামী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যে টিকে থাকবে না একথা আমি এখনই বিনা দ্বিধায় লিখতে পারি।

মানুষ যেমন এক পায়ে হাঁটতে পারে না, তেমনই গণতন্ত্রও দু’পা ছাড়া হাঁটতে অক্ষম। বাংলাদেশের বর্তমান সংসদেও কার্যকর একটি বিরোধী দল দরকার। সংখ্যায় তারা যাই হোন সংসদে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর দ্বারা নয়, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শে আস্থাবান একটি বিরোধী দল দরকার। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির সদস্যরা জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আসন নিলেও একটি প্রকৃত বিরোধী দল গঠন করতে পারবেন কি? আমার সন্দেহ আছে।

বিলাতে যেমন পার্লামেন্টে বিরোধী দলকে বলা হয় ‘Her Majesty's Opposition’, তেমনই বাংলাদেশের বর্তমান সংসদেও এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে আসন নিলে ‘হার ম্যাজেস্টির বিরোধী দলের’ ভূমিকা ছাড়া প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে তা মনে হয় না। সাবেক রাষ্ট্রপতি এখন অসুস্থ। তাঁকে বার বার সিঙ্গাপুর যেতে হয়। খোদা না করুন তার যদি কিছু হয়, তাহলে পাকিস্তানে আইয়ুবের পর কনভেনশন মুসলিম লীগের যে অবস্থা হয়েছিল জাতীয় পার্টির সেই অবস্থা হতে পারে।

এরশাদ সাহেবের অভূতপূর্ব ‘উইলের’ বলে জাতীয় পার্টির নেতা হতে চাইবেন জি.এম কাদের। দলের মেজরিটি চাইবেন বেগম রওশন এরশাদকে। শেষ পর্যন্ত দলই টিকবে কি না সন্দেহ। আমার ধারণা বিএনপি’র পঞ্চপাণ্ডব হয়ত শেষ পর্যন্ত সংসদে আসবেন। ঐক্যফ্রন্ট থাকবে না। তবু বিএনপি’র পাঁচ এবং গণফোরামের দুই সদস্য এবং সেই সঙ্গে জাতীয় পার্টির ২০ সদস্য মিলে যদি কোনো আদর্শগত ঐক্য নয়, কর্মসূচিগত ঐক্য গড়ে তুলে সংসদে বিরোধী দলের শূন্যতা পূরণ করেন, তাহলেও এই সংসদ কার্যকর ও জীবন্ত হয়ে উঠবে।

সংসদে আওয়ামী লীগের এখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আওয়ামী মহাজোটের কোনো শরিক দলই মন্ত্রিত্ব পাননি। তারা যদি মন্ত্রিত্বের লোভে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা না করে সংসদে গঠনমূলক বিরোধিতার ভিত্তিতে গঠিত বিরোধী দলে যোগ দেন, তাহলে তা দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষায় একটা বড় পদক্ষেপ হবে।

[ লন্ডন, ২৬ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৯ ]