‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ একটি দেশকে বদলে দিতে পারে

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫২

আমরা মানুষকে স্বপ্ন দেখাই। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে বলি। অসাধ্যকে সাধন করে লক্ষ্য অর্জন করা ও সফল হওয়া একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু কিভাবে এই সফলতা আসতে পারে তা নিয়ে আমাদের যেভাবে ভাবা উচিত— সেভাবে আমরা ভাবি না। অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা হতে পারে আমাদের আগামীদিনের আত্মশক্তি।  আগে হয়ত ভাবিনি কিন্তু এখন ভাবতে তো কোনো বাধা নেই। সেটি নেই বলেই অপূর্ণতাকে কানায় কানায় পূর্ণ করে আমাদের নিজেদের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমরা পৃথিবীকে জাগাতে চাই, মানুষকে জাগাতে চাই। এটি যদি আমরা মন ও প্রাণের মেলবন্ধনের বিশ্বাস থেকে চাই, তবে আমাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং নিয়ে ভাবতে হবে। পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই চিন্তা করতে পারে আর কেউ নয়। এই চিন্তাশক্তি যে কতটা শক্তিশালী তার প্রয়োগ না ঘটালে বোঝা খুব কঠিন। 

চিন্তা কি বিজ্ঞান নাকি কলা— এ  নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে। যদি চিন্তাকে বিজ্ঞান হিসেবে মেনে নেই, তবে ধরে নিতে হবে চিন্তার মৌলিক কতগুলো বিষয় আছে যা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। যদিও চিন্তাকে অদৃশ্য শক্তির আধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তারপরও চিন্তার প্রকাশ দৃশ্যমান। চিন্তার ভেতরের চিন্তাকে গবেষকরা বলছেন মেটাকগনিশন। যেটি ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর বাস্তব ফলাফল বা প্রয়োগ। এই ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর ভিন্নতায় চিন্তার প্রয়োগ বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। কল্পনাশক্তি থেকে চিন্তাশক্তি বের হয়ে আসে বলে মানুষের কল্পনারও ভিন্নতা চোখে পড়ে।

খুব সাধারণ একটি বিষয়কে আমরা ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে আনতে পারি। মনে হতে পারে বিষয়টি খুব সাধারণ। কিন্তু যখন এটি ক্রিটিক্যাল থিংকিং হয়ে যায়, তখন তা অসাধারণ আর অভূতপূর্ব হয়ে ওঠে। যেমন, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বোস উদ্ভিদ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বের করে ফেললেন উদ্ভিদের জীবন আছে। উদ্ভিদেরও আনন্দ, বেদনা ও ভালবাসার অনুভূতি আছে। এটি প্রমাণের জন্য তিনি ক্রিস্কোগ্রাম নামের একটি যন্ত্র আবিষ্কার করলেন। যার দ্বারা তিনি তা প্রমাণ করে দেখাতে সক্ষম হলেন। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম পাট গাছ নিয়ে গবেষণা করতে করতে একদিন পাটের জীবন রহস্য বা জেনোমসিকুয়েন্স আবিষ্কার করে ফেললেন।

কলকাতা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের অটোগ্রাফ, বাইশে শ্রাবণ— এই সিনেমাগুলো হয়ত আমরা দেখেছি। কিন্তু তাঁর একটি সিনেমা বক্স অফিসে সাড়া ফেলতে পারেনি। সেটির নাম ছিল—নির্বাক। একটি গাছ যে মানুষের মতো ভাবতে পারে, মানুষের প্রেমে পড়তে পারে এই বিষয়টি সিনেমার একটি গল্পের মধ্যে এসেছে। সৃজিত পার্কের রাস্তার পাশের আর দশটা গাছের মতো একটি সাধারণ গাছের গল্প এখানে তুলে ধরেছেন। গাছটির ছায়ায় বেষ্টিত হয়ে আছে একটি কাঠের বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে একটি মেয়ে প্রায়ই এসে বসে থাকে। গাছটির ভালো লাগতে শুরু করে তাকে। গাছটির সঙ্গে মেয়েটির কোনো কথাবার্তা নেই, কেবল গভীর নীরবতা। কিন্তু গাছটি মেয়েটিকে দেখতে দেখতে একসময় তার প্রেমে পড়ে যায়। প্রেমিকার কাঁধে হাত রাখে নিজস্ব ভঙ্গিতে, প্রেমিকাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। গাছের স্বপ্নের সেই দৃশ্যটি নির্বাক সিনেমায় মানুষের মধ্যে একটি অভূতপূর্ব বিস্ময় ও শিহরণ সৃষ্টি করে।

সারা পৃথিবীতে গাছ নিয়ে গবেষণা চলছে। চিকিত্সা বিজ্ঞানের বিভিন্ন রোগের ওষুধ গাছের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ধারণা গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গাছকে ব্যবহার করে বিদ্যুত্শক্তি উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এই নিয়ে গবেষণাও চলছে। গাছ নিয়ে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। এভাবে ‘মানুষ’ এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্রিটিক্যাল থিংকিং সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে বলা যায়, পৃথিবীতে যা কিছু আছে হোক না তা ভালো কিংবা মন্দ সেটি থেকে বিস্ময়কর ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর জন্ম হতে পারে। যা হার্ভার্ডের গবেষণার ফলাফলকে প্রমাণ করছে। পৃথিবীর যে দেশগুলো প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে একটি কোর্স হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য থিংকিং স্কিলের উপর পরীক্ষা দিতে হয়। এসব দেশে আমাদের দেশের মতো মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য না দিয়ে ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। যে শিক্ষার্থীর ক্রিটিক্যাল থিংকিং যত বেশি তাকে তত বেশি মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ঠিক এর উল্টোটি দেখা যায়। এর ফলে আমরা প্রকৃত সৃষ্টিশীল মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যাকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছি— যা একটি দেশের মেধার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।

সমাজবিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বলে থাকেন, ৬-২৬ বছর বয়সের মধ্যে মানুষের মেধা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে। এর অর্থ হচ্ছে, প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন শিক্ষার্থীদের এই চিন্তার বিকাশ ঘটতে থাকে। বিজ্ঞানী নিউটন ও আইনস্টাইন এই সময়ের মধ্যে মহাকর্ষীয় ধারণা ও আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। কিন্তু আমরা সেই চিন্তাশক্তিকে চিহ্নিত করে তাকে কিভাবে আরও ধারালো ও দীর্ঘস্থায়ী করা যায় সেটি নিয়ে তেমন একটা ভাবছি না। ক্রিটিক্যাল চিন্তাধারাকে শিক্ষায় প্রাধান্য দিয়ে গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার ধারণা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। তবেই ইতিবাচক চিন্তাশক্তির প্রভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। ইসরাইলের লোকসংখ্যা মাত্র ৮.৭ মিলিয়ন হলেও ক্রিটিক্যাল থিংকিং চর্চার কারণে গোটা বিশ্বের রাজনীতি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করছে।

একটি দেশে মেধাবী ও গুণীজনের সংখ্যা কমতে থাকলে ধরে নিতে হবে যে, সেখানে ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর কোনো কদর নেই। কারণ কে সাধারণ, কে অসাধারণ, কে বিজ্ঞানী, কে বুদ্ধিজীবী এগুলো নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্রিটিক্যাল থিংকিং একটি কোয়ালিটিটিভ পরিমাপক হিসেবে কাজ করে। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যদি জানার আগ্রহ ও প্রশ্ন তৈরি করা যায়, যদি বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়া যায়, মাথা খাটিয়ে বিভিন্ন ছোট-বড় সমস্যার সমাধান করা যায়, যদি মানুষ শ্রোতা হতে পারে এবং মানুষ যদি তার নিজের আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তিকে বাড়াতে পারে তবে তার মধ্যে ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর জন্ম হতে পারে। প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, এখানে দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কে কত বেশি কাজ করতে পারে, কতটা সততার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলে— এসব বিবেচনা করে পদোন্নতি হওয়া উচিত। এর সঙ্গে যে যেখানে আছে সেখান থেকে তার চিন্তাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কিভাবে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা সৃষ্টি করতে পারে সে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এখন আমাদের দরকার ক্রিটিক্যাল থিংকিংকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র ও মেধাবী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা।

n লেখক: অধ্যাপক,  ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর