পৃথিবীতে সম্ভবত সবচাইতে বড় রাজনৈতিক প্রতারণা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে। এখন এটা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ‘১৯৭১-এর মার্চে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র তত্কালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দলের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার নামে যে বৈঠকের আয়োজন করেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া এবং গভীর প্রতারণামূলক। আসলে বাঙালিদের ওপর নৃশংস সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতির জন্য এই বৈঠকের নামে কালক্ষেপণ করে তারা বিমানে বেসামরিক পোশাকে মূলত সৈন্য এবং সেই সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করেছিল। এছাড়া জাহাজভর্তি অস্ত্র গোলাবারুদও তারা এনেছিল এই সুযোগে। বঙ্গবন্ধুর কাছে এই খবর পৌঁছলেও হঠাত্ করে আলোচনা বন্ধ করার উপায় ছিল না। তারপর ২৫ মার্চে পাকিস্তানি সশস্ত্র দানবরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর। নয় মাস একটানা চালিয়েছিল তারা এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। তাই ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হলেন বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানিদের এই হত্যাযজ্ঞ থেকে যতটা পারা যায় মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা। পাকিস্তানি জঙ্গি শাসকরা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা, বাংলাদেশের মানুষকে চায় না। চায় শুধু এদেশের ভূমি। তাই পাকিস্তানি খুনিরা বাঙালিদের হত্যায় কোনো বাছবিচার করেনি। এখন সবাই জানে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন হত্যাকাণ্ড বিরল। বাঙালিদের এই রক্তপাত অতিরিক্ত মাত্রায় হয়েছিল সত্য কিন্তু পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুর ভাষায় সাত কোটি বাঙালিকে ‘দাবায়ে’ রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এখন একটি স্বাধীন সার্বভৌম গর্বিত রাষ্ট্র। আমাদের অর্থনীতিও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক চাঙ্গা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’। তিনি কথা রেখেছেন, ৩০ লাখ বাঙালির জীবন দানের পর তিনি নিজেও পরাজিত শক্তির এজেন্টদের হাতে প্রায় সপরিবারে জীবন দিয়েছেন।
আসলে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের অগেই কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা মানলে বাংলা প্রায় স্বাধীনই হয়ে যেত। পাকিস্তানিরা সেটা বুঝতে পেরেই বাঙালির ওপর হামলা শুরু করে দিয়েছিল। বাঙালিরাও ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল। মার্চ মাসে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি সার্জেন জহিরুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুুজ্জোহা সঙ্গে প্রতিরোধকারী অনেক নাম না-জানা মানুষও খুন হয়েছিলেন পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণে।
বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণে এই নিমর্ম হত্যাকাণ্ডেরই অবসান চেয়েছিলেন, পাকিস্তান সৈন্যদের বলেছিলেন, ব্যারাকে ফিরে যেতে। কিন্তু ব্যারাকে তো তারা ফিরেই না, বরং পৃথিবীর অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও নারীদের ওপর অত্যাচারে মেতে উঠল। অবশ্য বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হেরে গিয়ে হলো চরম অপমানিত। আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় বাহিনী তাদের রক্ষা না করলে একটি পাকিস্তানি সৈন্যও পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারত না। দুই বছরে ভারতীয় শিবিরে বন্দি থেকে ভারতীয় বদান্যতাই তারা দেশে ফিরল মাথা নত করে।
১৯৭১ সালের মার্চে আসলে বলতে গেলে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচালক। তার কথায়ই সরকার চলত। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য পাকিস্তানের বন্দিত্ব থেকে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল, ফিরে এসে তিনি পরিচালনার ভার নিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের। তার পরের ঘটনাবলি এখন ইতিহাস।
লেখক : অনারারি অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
