স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। উদ্যাপন করছে সুবর্ণজয়ন্তী। একটি রাষ্ট্রের জীবন পরিক্রমায় এই অর্ধশত বছর বড় কোনো অতিক্রমণ নয়। কিন্তু ৫০ বছরে এই জাতি রাষ্ট্রের ভিত্তি কতটা মজবুত হয়েছে তা একবার বিচার করে দেখার সুযোগ তো রয়েছে। যে আদর্শিক অবস্থান নিয়ে এই দেশের জন্য লড়েছেন মানুষ, আত্মাহুতি দিয়েছেন ৩০ লাখ বীর বাঙালি আর সম্ভ্রমহারা হয়েছেন লাখো নারী, ৫০ বছরে সেটির অবস্থা কি তাতো একবার ভেবে দেখা দরকার। সরকার আসে সরকার যায় রাষ্ট্র তো স্থায়ী অস্তিত্ব। তো রাষ্ট্রের অর্জন কী?
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এ দেশের ভবিষ্য নিয়ে বিশ্ব মোড়লদের অনেক শঙ্কা আর আশাহীনতা ছিল। একই সঙ্গে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে অকার্যকর, ব্যর্থ ও পশ্চাতপদে পরিণত করতে দেশি-বিদেশি বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব কিছুকে মোকাবিলা করে জাতির পিতার নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ ৫০ বছরে অনেক এগিয়েছে। এই এগোনো হচ্ছে বৈষয়িক। আর্থসামাজিক দিক থেকে, অবকাঠামো উন্নয়নের দিক থেকে আমরা অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছি ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২১ পর্যন্ত সময়ে। মাঝের ২৮ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এক বিশ্বাসঘাতক মোশতাক ও তাদের দোসরেরা মিলে রাষ্ট্রপিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা ও তার সরকার উত্খাত করে বাংলাদেশের উলটো যাত্রার সূচনা করে। সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া, এরশাদ এবং তাদের দোসর সাত্তার-খালেদা জিয়া-ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের সরকার মোশতাকের পথ ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাই শুধু নয়, আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ভাবাদর্শ আর বঙ্গবন্ধু মুজিবের আদর্শের উলটো পথে দেশকে নিয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে আমরা বৈষয়িক উন্নয়নে প্রায় ৫০ বছর আর মতাদর্শগতভাবে প্রায় শত বছর পিছিয়ে গিয়েছি।
আজকের বাংলাদেশ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে থাকার কথা ছিল না। এর প্রধান কারণ রাষ্ট্রের আদর্শচ্যুতি। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে সমরতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র তথা রাজনীতি এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ম ব্যবসায়ীদের আধিপত্য সর্বোপরি পাকিস্তানি ধ্যানধারণায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আমাদেরকে পিছিয়ে দিয়েছে। যদিও আমরা এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভেতর দিয়েও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা প্রতিনিয়ত করছি। এবং এই শক্তির উত্সও শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা যদি এ বিষয়টি মাথায় রাখি তাহলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। তাহলো—মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের শেষ ধাপ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের হাতিয়ার। মুজিবাদর্শ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সরকার গঠনে এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে আমাদের অর্জন ক্রমশ পশ্চাত্মুখী। এ প্রসঙ্গে জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন—‘আর একটা জিনিস। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্র্রদায়িক, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে, সে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন, তিনি রাব্বুল আলামিন, রাব্বুল মুসলেমিন নন। হিন্দু হোক, খ্রিষ্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক, সমস্ত মানুষ তার কাছে সমান। সেজন্যই একমুখে সোশ্যালিজম ও প্রগতির কথা আরেকমুখে সাম্প্রদায়িকতা চলতে পারে না। সমাজতন্ত্র, প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আজকের বাংলাদেশে প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলছে। তাই বলব— আজকের বাংলাদেশে মুজিবাদর্শ বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন খুব জরুরি। রক্তে কেনা বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পালটে ফেলছে। আইএসএর নামে জঙ্গি হামলার অনুসন্ধান করলে একটি সূত্রই বের হয়ে আসবে তা হলো—এরা সবাই পঁচাত্তরের সেই ঘাতকদের এজেন্ট। আমরা মনে করি এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে আবার ফিরে যেতে হবে জনকের কাছে। আজকে ধর্মের নামে যে অপরাজনীতির যে সন্ত্রাস বিস্তার ঘটছে তার শেকড়চ্যুতি ঘটাতে হলে এর বিকল্প নেই। কেননা সাম্রাজ্য যদি হয় আমাদের অন্যতম সমস্যা তাহলে ধর্মসন্ত্রাস (অপব্যাখ্যার মাধ্যমে) হচ্ছে বিষফোড়া। এটা সারাতে না পারলে আমাদেরকে আরো কঠিন মূল্য দিতে হবে। তাই এ সমস্যার সমাধানেও আমরা জাতির জনকের দৃষ্টিভঙ্গির কাছে দর্শনের কাছে ফিরতে হবে।
জাতির পিতার শতবার্ষিকীতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আমাদেরকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে প্রত্যর্পণ করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতি উলটো পথে হাঁটছে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফিরুন।’ তিনি আরো বলেছেন ‘আজ আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করছি। এ সময়ে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে তা ভেবে দেখতে হবে।’ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও একই কথা বলতে চাই। বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষায় রচিত বাংলাদেশে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়া এবং লুটেরাদের পক্ষে অর্থনীতিকে দাঁড় করানো কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে ভেবে দেখা দরকার। লুটেরাতন্ত্র আর বৈষম্যহীন অর্থনীতি কি সমার্থক?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর মুজিবের সংগ্রাম একই সুতোয় গাঁথা। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ রাজনীতি, বৈষম্যহীন সুষম বণ্টনের অর্থনীতি সব মিলিয়ে ইতিবাচকতার জাতীয়তাবাদী বাঙালি—বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এই ৫০ বছরে আমরা কতটা সক্ষম হয়েছি? নাসিরনগর, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জের শাল্লা, কক্সবাজারের রামু, ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত প্রশ্নে সীমাহীন ধৃষ্টতা নিয়ে আমরা কতটা এগুতে পেরেছি? ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা কওমি হাফেজি মাদ্রাসা, মানহীন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অরাজকতার জন্ম দিয়েছে, তা আমাদের ভবিষ্যত্ বংশধরদের অগ্রযাত্রাকে ও স্থায়ী উন্নয়নের পথযাত্রাকে ব্যাহত করতে বাধ্য।
আমরা মনে করি, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মসন্ত্রাস (অপব্যাখ্যার মাধ্যমে) মোকাবিলায় আমাদের কৌশলী হতে হবে এবং সেই সঙ্গে সতর্ক ও সাবধানী। এজন্য নিজেদের গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকেও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে গণতন্ত্র হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র দুর্বল হয়, এমন কোনো পথে অগ্রসর হলে তা আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। আমরা জানি, সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নজরে আসার জন্য, নেতৃত্বকে পরিতুষ্ট করতে নানাভাবে রাষ্ট্র ও সরকারের সাফল্য গাঁথা গাওয়া হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বড় ব্যাপার। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যা এই উন্নয়নকে ধারণ করে অগ্রযাত্রাকে সুগম করতে পারে। সে লক্ষ্যে আমাদের কাজ কী? রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আর অর্থনীতির পরিচালনায় যে পথ অনুসরণ করা হচ্ছে তা কী আদৌ আমাদেরকে দীর্ঘস্থায়ী অগ্রযাত্রার স্বস্তি দেবে? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা দেশপ্রেমিক সব নাগরিকের দায়িত্ব। কতিপয় চাটুকার আর তল্পিবাহকের মধুমিশ্রিত কথায় বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। লুটেরাতন্ত্রের অবসান একান্তভাবেই কাম্য। নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দাঁড় করানো আবশ্যক। আমলাতান্ত্রিকতা নয়, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং জনপ্রশাসনে। সর্বোপরি আইনের শাসন ও জবাবদিহিতামূলকজন প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সুশাসনের পক্ষের বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্যাপনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং ’৭৫-পরবর্তী একজন প্রতিরোধ সংগ্রামী হিসেবে প্রশ্নগুলো এসে ভিড় জমায় মনের গহিনে। যখন দেখি বাংলা ভাষা বিদ্বেষীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিচ্ছে, চিহ্নিত লুটেরারা অর্থনীতির নেপথ্যের চালক, মুক্তিযুদ্ধে তথাকথিত নিরপেক্ষবাদীরা (এদের অনেকে ১৬ ডিসেম্বর বাহিনীও হয়েছে) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, মুজিব হত্যায় যারা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিবাদের ঝাণ্ডা হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে আসেনি তারাই এখন মুজিবাদর্শের পতাকাবাহী তখন সামগ্রিকভাবেই আমরা শঙ্কিত না হয়ে পারি না এবং এই শঙ্কার অবসান হওয়া দরকার। রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই এই শঙ্কা দূর করা সম্ভব। রাষ্ট্রপতি যেমনটি বলেছেন, আসুন, সকলে মিলে মুজিবাদর্শে ফিরে যাই। তাহলেই আমাদের সহযোদ্ধাদের আত্মাহুতি, মা বোনদের ত্যাগ আর লাখো কোটি মানুষের সংগ্রামে অর্জিত বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে দৃপ্ত পদভারে।
লেখক :সংসদ সদস্য, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, ’৭৫-পরবর্তী প্রতিরোধ যোদ্ধা, সম্পাদক, মত ও পথ
