স্বাগত নরেন্দ্র মোদি

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ২২:০১

স্বাগত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ, অকৃত্রিম বন্ধু, নিকটতম ও বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছে। যে স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারতের অবদান ছিল অনন্য, অসামান্য। ভারতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিল। বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন ভারতের সেনারাও। অনেক ভারতীয় সেনাও প্রাণ উত্সর্গ করেছিলেন।

সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী আসছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতকের উদ্যাপনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। একই সঙ্গে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া তার সফরের অন্যতম লক্ষ্য। এছাড়া দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিও একসঙ্গে উদ্যাপন করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর সম্পর্ক এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, এখন একে-অপরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সহযোগিতা, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সহায়তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্পর্ক মাত্রা পেয়েছে। সর্বশেষ করোনা মহামারি মোকাবিলা ও টিকা-সহায়তা সম্পর্কের নতুন দিক খুলে দিয়েছে। যার ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বিশ্বের কাছে একটি মডেলে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রসীমা ও স্থল সীমান্তের মতো বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে দুই প্রতিবেশী দেশ যেভাবে মীমাংসা করেছে তার নজির বিশ্বে বিরল।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কিছু বিষয় এখনো অমীমাংসিত। শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে বোঝাপড়া ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সেই সমস্যারও সমাধান হবে। বাংলাদেশ-ভারত দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক দিনে দিনে আরো ঘনিষ্ঠ এবং আস্থার হবে এবং যার মাধ্যমে দুই দেশের মানুষ উপকৃত হবে।

তার সফরকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, বিজয় সরণি ও প্যারেড স্কয়ার এলাকা, সোনাওগাঁও হোটেলসহ তার সফরের স্থানগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির প্রতিকৃতি, বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে, চলছে আলোকসজ্জাও। পাশাপাশি কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মোদির ৩৩ ঘণ্টা :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুই দিনের সফরে আজ শুক্রবার সকালে ঢাকায় আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। মোদির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। সফরকালে মোদি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, কয়েক জন বিশিষ্ট রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি সকাল ১১টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে নরেন্দ্র মোদিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। প্রসঙ্গত, এটি নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর এবং করোনা মহামারিকালে তার প্রথম বিদেশ সফর। এর আগে ২০১৫ সালের ৬ থেকে ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার ঢাকা সফর করেন।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন। বিকালে তিনি জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে স্বাধীনতা দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় তিনি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু-বাপু মিউজিয়াম উদ্বোধন করবেন। এখানে তার সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের দ্বিতীয় দিন আগামীকাল শনিবার সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জ যাবেন। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করবেন। সেখানে তিনি প্রার্থনা করবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় হিন্দু সম্প্র্রদায়ের লোকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

নরেন্দ্র মোদি ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা যাবেন হেলিকপ্টারে। সাতক্ষীরা সফর শেষে সেখান থেকে তিনি যাবেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। টুঙ্গিপাড়ায় তাকে স্বাগত জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রথম কোনো বিদেশি সরকারপ্রধান টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন। টুঙ্গিপাড়া থেকে তিনি যাবেন কাশিয়ানির ওড়াকান্দি। সেখানে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দির পরিদর্শন করবেন এবং স্থানীয় মতুয়া নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। তারপর হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় ফিরবেন। বিকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সংযোগ (কানেকটিভিটি), বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা, পানিবণ্টন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতাসহ দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তার সফরকালে দুই দেশের মধ্যে তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো দুর্যোগ মোকাবিলা সহযোগিতা। আর বাকি দুইটি হলো : দুই দেশের ইনস্টিটিউটশনের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে সহযোগিতা। এমওইউর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। এছাড়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে মুজিবনগর স্বাধীনতা সড়ক, ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন করবেন।

বুধবার মোদির সফর নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এই সফর হবে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি মাইল ফলক। তিনি বলেন, করোনা মহামারি সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই সম্পর্ককে অনুকরণ করতে চাইবে অন্য দেশগুলো।

সফরে বিশেষ চমক :নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে তার সঙ্গী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঐতিহ্যবাহী মুজিবকোট পরিধান করবেন। ভারতের বিখ্যাত খাদি কাপড় দিয়ে এসব মুজিবকোট বানানো হয়েছে। ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর ঘোষণা অনুযায়ী মোদির সফরের আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার ১০০টি মুজিবকোট তৈরির অর্ডার দেয় ভারতের কেভিআইসিকে। ইতিমধ্যে এগুলো প্রস্তুত হয়ে গেছে।

উপহার হিসেবে আসছে ১২ লাখ টিকা :মহান স্বাধীনতা দিবস ও নরেন্দ্র মোদির সফর উপলক্ষ্যে আরো ১২ লাখ ডোজ করোনা ভাইরাসের টিকা বাংলাদেশকে উপহার দিচ্ছে ভারত। আজ শুক্রবারই এই টিকা পৌঁছাবে। ভারত সরকার এর আগে ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে দিয়েছিল বাংলাদেশকে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বৈশ্বিক উদ্যাপনে দুই দেশ :বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনকে স্মরণীয় করতে অংশীদার হয়েছে ভারতও। জাতিসংঘসহ সদর দপ্তরসহ ১৮টি দেশে যৌথভাবে সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করবে বাংলাদেশ ও ভারত। ২০২১ সাল জুড়ে ৯টি দেশের রাজধানীতে বাংলাদেশ ও অন্য ৯টি দেশে ভারত অনুষ্ঠানমালার আয়োজক হবে।