স্কুলের আমি

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২১, ২০:২৫

পিয়াস মজিদ, কথাসাহিত্যিক ও কবি

মুনলাইট কিন্ডার গার্টেন, কুমিল্লা আমার প্রথম স্কুল। পরে জেনেছি, বুয়েটের নিহত ছাত্রী সনিও এই স্কুলে পড়েছেন একদা। ১৯৮৮-এর ভয়াবহ বন্যার পরপর আমার স্কুলে ভর্তি হওয়া। সেসময় ক্লাসরুম, সার্বিক পরিবেশ সবই ছিল প্রতিকূল তবু স্কুলে যেতে পারার আনন্দতো ছিল অপার।

প্রত্যেকটি স্কুলই একেকভাবে প্রিয়। তবে নিঃসন্দেহে কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রতি ভালো লাগাটা অন্যরকম।

কুমিল্লা জিলা স্কুল প্রায় ২০০ বছর বয়সী স্কুল। আমার ভাবতে ভালো লাগতো এবং এখনও লাগে এই ভেবে যে, কুমিল্লা জিলা স্কুলের ছাত্র শচীন  দেববর্মণ এবং আমিও। ঐতিহ্যের পরম্পরা বিষয়টা অনুভব করে গর্ব হতো। তার উপর এই স্কুলে ভর্তি হতে প্রাণান্ত পরিশ্রম হতো কিন্তু স্কুলে পড়াশোনার খুব যে কড়াকড়ি ছিল তা নয়। একটা মুক্ত পরিবেশে আমরা পড়াশোনা করেছি কিন্তু সবাই ফলাফলও ভালই করেছি। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও ক্রীড়াক্ষেত্রে এই স্কুলের প্রণোদনা কখনও ভুলবার নয়।

স্কুলজীবনের প্রিয় শিক্ষকের তো শেষ নেই। তবে বিশেষভাবে বলতে চাই, গুলবাগিচা স্কুলের মমতাজ  বেগম ম্যাডামের কথা এবং কুমিল্লা জিলা স্কুলের আজিজুন্নেসা ম্যাডামের কথা। মমতাজ ম্যাডাম ক্রীড়াও সংস্কৃতির শিক্ষক ছিলেন আর আজিজুন্নেসা ম্যাডাম বাংলার। তাঁদের ভালো লাগতো কারণ তাঁরা আমাদের সহমর্মী হয়ে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতেন। তাঁদের আন্তরিক উপস্থাপনার কারণে মনে হতো, ‘ইশ,, ক্লাসগুলো যদি আর একটু দীর্ঘ হতো!’

আমি মনে করি প্রকৃত শিক্ষকের পাঠদান এমনই স্বতঃস্ফূতর্ হয় যে তাঁকে কোনো ‘কৌশল’ করতে হয় না। আমার প্রিয় বিষয় অবশ্যই ছিল বাংলা ও ইংরেজি কারণ দেশ-বিদেশের গল্প-কবিতার সন্ধান ম পেতে মন মুখিয়ে থাকতো সবসময় তবে বাংলাও ইংরেজি ব্যাকরণের প্রতি ভীতি ও ছিল কিছুটা।

স্কুলের পর শিক্ষকের কাছে পড়া বা কোচিং করা কোনোটাই তেমন করা হতো না তবে একজন গৃহশিক্ষক ছিলেন যিনি এসএসসি পরীক্ষার আগে আমার অঙ্কভীতি কাটাতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলতেন, গল্পের মতো গণিতকে ভালোবাস। গণিত সোজা হয়ে দেখা  দেবে তোমার কাছে। ৫-৬ ঘণ্টা। ডে-শিফটের স্কুল ছিল বলে সকালেই পড়াটা হতো বেশি। পড়াশোনায় আমার মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। আসলে স্কুল জীবনে আমার পড়াশোনায় আমার মায়ের ভূমিকা শিক্ষকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

বড় হয়ে স্বাধীন মানুষ হতে চাইতাম। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা বলতো পরিবার, সমাজ। আমি ভাবতাম, যদি স্বাধীনভাবে নিজের গন্তব্য ঠিক করতে পারতাম!

 

 এখনকার সবশিশু-কিশোরকে তো দেখি। তারা ছোট থেকেই অনেক জ্ঞান রাখে হয়তো পারিপার্শ্বিক কারণে তবে সিলেবাসের চাপে পর্যুদস্ত তাদের মলিন মুখ দেখে কষ্ট হয় খুব। সুখের স্মৃতি অগণন। তবে, এসএসসি পরীক্ষায় অঙ্কে মাত্র ৬২ পেয়েও শুধু বাংলা, ইংরেজিতে ভালো নম্বর পেয়ে কুমিল্লা বোর্ডে মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে ভালো লেগেছে এই ভেবে যে, চাইলে সবই সম্ভব।

আর দুঃখের স্মৃতি বলতে, যেদিন শুনলাম আজই স্কুলের শেষদিন। সেদিন বুকফাটা কান্না পেল, ভাবলাম-এত দ্রুত কেন এত বড় হয়ে গেলাম!

পাঠ্যবইয়ের বাইরে বন্ধুদের কাছ থেকে তিন গোয়েন্দা আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে পাওয়া বই পড়তাম। সে সময়ে পড়া স্মরণীয় বই, আনাফ্রাঙ্কের ডায়েরি, বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ আর শরদিন্দুর ‘ঝিন্দেরবন্দী’।

শিক্ষা ব্যবস্থার সবল দিক হলো, এত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যেও বছরের প্রথম দিন বইকে কেন্দ্র করে এখানে একটি উত্সব হয়।

দুর্বল দিক হলো, এখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত অনেক শিশু-কিশোরকে আমরা পথেঘাটে কাজ করতে দেখি। উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হয়েও আমরা এ দৃশ্য কেন দেখব!

গৌতম বুদ্ধের বাণীটাই উচ্চারণ করব সবার প্রতি ‘ আত্মনংদীপন; নিজেই নিজের প্রদীপ হও’।