বাংলাদেশ ও ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আগামী ৫০ বছরের জন্য দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বহুমুখী সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচনে দুই নেতা সম্মত হন। যাতে অগ্রাধিকার পাবে সংযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এছাড়া বৈঠকের পর ভারতের উপহারের ১২ লাখ ডোজ করোনা ভাইরাসের টিকা এবং ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্সের চাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শুক্রবার বাংলাদেশে আসা নরেন্দ্র মোদি তার সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল বিকাল ৫টার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে শেখ হাসিনা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দুই সরকার প্রধান প্রথমে কিছু সময় একান্তে বৈঠক করেন। পরে তাদের নেতৃত্বে শুরু হয় দুই দেশের প্রতিনিধি দলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, যা সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত চলে। বৈঠকে স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও উন্নয়ন সহযোগিতার যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া পানিবণ্টন চুক্তি, করোনা মহামারি মোকাবিলা, সীমান্ত ইস্যুসহ দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও স্থান পায়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যু উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার আহ্বান জানান। জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক সহযোগিতা দরকার। যাতে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা যায়। শেখ হাসিনা ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করলে নরেন্দ্র মোদি জানান, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান আগের মতোই আছে। এই চুক্তি সম্পাদনে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। সবগুলো নদীর পানি ন্যায়সংগতভাবে বণ্টনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সমর্থন দেন নরেন্দ্র মোদি।
দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নিয়ে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অত্যন্ত হূদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানবসম্পদ ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, সন্ত্রাসবাদ দমন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্জিত অভূতপূর্ব সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে আনা এবং বাণিজ্য অবারিত করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষ শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার ওপরও দুই প্রধানমন্ত্রী জোর দেন।
বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি জোরালো করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন দুই নেতা। সড়ক, রেল ও নৌপথে মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী উদ্যোগসমূহের প্রশংসা করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক প্রকল্পে যুক্ত হতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা ভারতকে জানানো হয়েছে। বিবিআইন মোটরযান চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ‘ত্রিদেশীয় সমঝোতা স্মারকটি দ্রুত স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তার ওপর দুই নেতা বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
কোভিশিল্ড ভ্যাকসিনের ২ মিলিয়ন ডোজ উপহারের জন্য এবং ৫ মিলিয়ন ডোজের প্রথম ব্যাচের দ্রুত ডেলিভারির জন্য বাংলাদেশ বন্ধুরাষ্ট্র ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ক্রয়কৃত অবশিষ্ট ভ্যাকসিন নিয়মিত সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিষয়ে উভয় নেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ শিগগিরই ‘দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উেক্ষপণ করবে। মহাকাশ ও স্যাটেলাইট গবেষণায় দুই দেশ একযোগে কাজ করে যেতে সম্মত হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উত্সব যৌথভাবে উদ্যাপনের বিভিন্ন পরিকল্পনাও তাদের আলোচনায় স্থান পায়। এ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীকে ২০২২ সালে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। এজন্য ৬ ডিসেম্বরকে ‘মৈত্রী দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। আগামী ৫০ বছরের সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে মাথায় রেখে বহমুখী ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দুই প্রধানমন্ত্রী তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কথা বলেন। নরেন্দ্র মোদি তিস্তা চুক্তির বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে ভারত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে এই ইস্যুতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে ভারত।
পাঁচ সমঝোতা স্মারক সই
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়। এগুলো হলো- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন ও প্রশমনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবং ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অব ইন্ডিয়ার (আইএনসিসি) মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্য বিকাশে অশুল্ক বাধা দূর করতে একটি সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা, বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিজিএসটি) সেন্টারের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, কোর্সওয়্যার ও রেফারেন্স বই সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা এবং রাজশাহী কলেজ মাঠের উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক।
সাত প্রকল্পের উদ্বোধন
বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন। এগুলো হলো—ঢাকা-জলপাইগুড়ি রুটে মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল, তিনটি সীমান্ত হাট, শিলাইদহের সংস্কার করা কুঠিবাড়ির বর্ধিত রবীন্দ্র ভবন, আশুগঞ্জে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর শহিদ সদস্যদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্বোধন করেন। মুজিবনগর থেকে নদীয়া হয়ে কলকাতা পর্যন্ত স্বাধীনতা সড়কের পরিকল্পনার ভিডিওচিত্র প্রদর্শন হয় এ বৈঠকে। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের ৫০ বছর উপলক্ষ্যে দুই দেশের ডাক বিভাগের স্মারক স্ট্যাম্প উন্মোচন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের মার্চে মুজিববর্ষের আয়োজনে মোদির উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছিল। মহামারি শুরুর পর গত এক বছরের মধ্যে সেই বাংলাদেশেই তিনি প্রথম সফরে আসেন। শুক্রবার বিকালে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নরেন্দ্র মোদি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে ‘বঙ্গবন্ধু-বাপু জাদুঘর’ উদ্বোধন করেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজেও যোগ দেন। সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে যান নরেন্দ্র মোদি। সেখান থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ওড়াকান্দি মন্দির পরিদর্শন করে ঢাকায় ফেরেন মোদি। প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পরে সন্ধ্যায় তিনি নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন।
