সীমাহীন ছুটে চলায় মানুষ যেন থামছে না। বাস্তবতার নিরিখে এই ছুটে চলা মূলত স্বার্থ ও স্বার্থপরতার খেলা। স্বার্থের টানে মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকে, এরই মধ্যে কেউ-বা নিজ স্বার্থ ও স্বার্থপরতার তফাত ভুলে সহমর্মিতা তুচ্ছ করে অন্যায়ের পথে চলে। স্বার্থ মানে নিজেকে ভালোবাসা, নিজের যত্ন নেওয়া এবং নিজের সুখকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যা তার প্রয়োজন। স্বার্থ নিয়ে মানুষ বাঁচে, কথাটি চরম ও চিরন্তন সত্য। তবে স্বার্থপরতা হলো কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবা, নিজের লাভ ও ক্ষতির বিষয় চিন্তা করা; কিন্তু অন্যদের উপেক্ষা করা, অবহেলা করা এবং তাদের স্বার্থকে তুচ্ছ ভাবা। স্বার্থ ও স্বার্থপরতার শাব্দিক অর্থ প্রায় কাছাকাছি হলেও স্বার্থপরতা একটি নেতিবাচক শব্দ।
জীবনে চাওয়া-পাওয়া, না পাওয়ার বেদনা, সংসারজীবনে অশান্তি, সম্পর্কের দূরত্ব, আত্মীয়তার মধ্যে বৈরী সম্পর্ক; সবই কোনো না কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব, যা স্বার্থপরতাও বটে। স্বার্থপরতার জন্য সমাজে মায়া-মমতা, ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্পর্ক, অনুভূতি, ত্যাগের জায়গাগুলো ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। স্বার্থপরতার জন্য কখনো-বা কাছের মানুষটিও শত্রু হয়ে যায়। দৈনন্দিন জীবনে ঘটে চলা ঘটনা-রটনা-দুর্ঘটনা, হানাহানি, মারামারি ইত্যাদি সবই গভীরভাবে পরখ করলে দেখা যায় এর পেছনে কোনো না কোনো স্বার্থ জড়িত, যে স্বার্থ কখনো স্বার্থপরতার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়।
ভালো চাকরি, ভালো কাজ পেতে তুমুল প্রতিযোগিতা হয়। পিরামিড কাঠামোতে একই প্রতিষ্ঠানে একই পদপদবিতে প্রথমে অনেকে থাকলেও পর্যায়ক্রমে পেশাদারিত্ব, দক্ষতার বিবেচনায় কেউ কেউ ওপরে ওঠে; কিন্তু ওপরে পদের সংখ্যা যত সংকুচিত হয়, স্বার্থের দ্বন্দ্ব তত বেশি হয়, যা কখনো স্বার্থপরতায় রূপ নেয়।
ব্যবসায়ে মুনাফা অর্জন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার ব্যবস্থায় একজন আরেক জনের মাঝে ব্যাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কেউ কেউ অধিক মুনাফার জন্য অবৈধ পথ অনুসরণ করে, ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, অপর প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষতি করে কিংবা গ্রাহকদের ঠকায়, যা স্বার্থপরতা ও অন্যায়।
দলের মধ্যে পদপদবি পেতে, নির্বাচনে নমিনেশন পেতে, নেতা-নেত্রীর কাছে যেতে, নিজের শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আবার অন্যরা অপেক্ষা করে, কে ক্ষমতায় যাবে, ক্ষমতায় গেলে তার কাছ থেকে কে কী নেবে সেই হিসাব কষে। কেউ কেউ আবার স্বার্থের জন্য চাটুকার বনতেও কুণ্ঠিত বোধ করে না।
অফিসের বস অধীনস্থদের কাছ থেকে যে কোনো উপায় কাজ আদায় করেন, ব্যস্ত জীবনে স্বার্থের জন্য অনেকেই সহমর্মিতা ভুলে যায়। চাকরিজীবীদের অনেকে অর্থশালী ব্যবসায়ীদের খুব সমীহ করেন, অনেকে নিজ পদপদবি ব্যবহার করে তাদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধাও দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে অবসর গ্রহণের পর তাদের কাছে চাকরি বা ব্যবসায়ের প্রত্যাশা থাকে। চতুর ব্যবসায়ীরাও তাদের বড় বড় আশ্বাস দিয়ে সুকৌশলে তাদের ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধি করেন; কিন্তু অবসরে গিয়ে চাকরিজীবী ঐ ব্যক্তিদের কতটুকু স্বার্থ পূরণ হলো, বাস্তবে কী পেল তা সময়ই বলে দেয়।
বন্ধুত্বের মাঝে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, কারো উত্থান কারো কারো মনে কখনো হিংসা জন্মায়, বন্ধু বড় হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ মানতে পারে না; কিন্তু বন্ধুর ভালো তো খুশির কথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর তালিকায় কত জনই তো আছে; কিন্তু যে বন্ধুটির সামাজিক পদমর্যাদা আছে, ভবিষ্যতে সামনে যাওয়ার সুযোগ আছে, তাকে কতভাবেই না সমীহ করে, তার কোনো পোস্ট পেলে দীর্ঘ প্রশংসা করে। আবার যার সামাজিক মর্যাদা আছে, কিন্তু আর ওপরে উঠবে না, তার কাছে কিছু পাওয়া যাবে না, তাদের পোস্টে শুধু লাইক দিয়েই ক্ষান্ত অথবা তাও করে না। আর যদি সামাজিক মর্যাদাই না থাকে তাহলে আপন আত্মীয় হলেও বন্ধুর তালিকায় রাখতে চায় না।
সমাজে ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য অথবা স্বার্থহানির জন্য একে অপরের সমালোচনা করেন। আলোচনা-আড্ডায় কে কার চেয়ে বড়, এ নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়। স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ যার দাপট আছে তার কাছে ভিড় করেন, সমাজে যিনি প্রতিষ্ঠিত সবাই তাকে সমীহ করেন। যার অর্থ-সম্পদ আছে, তিনি শিক্ষিত না হলেও, দামি কথা বলতে না পারলে ও স্বার্থান্বেষী মানুষ তার কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন, মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়, পাছে যে স্বার্থ আছে।
আধুনিক সমাজে সবাই যেন শুধু একাই বড় হতে চায়, অন্যরা কে কী পেল তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই, যা প্রকৃতপক্ষে স্বার্থপর তাকে সংজ্ঞায়িত করে। আবার সমাজে শক্তিশালী, ধাপটি, অর্থবান না হলে তার কাছে কেউ যায় না। দরিদ্র আত্মীয় অসুস্থ হলে তার খোঁজ রাখে না; কিন্তু অর্থবান আত্মীয়র খোঁজ সব সময় রাখেন। যার অর্থবিত্ত নেই, সমাজে প্রতিষ্ঠিত নন, তিনি সঠিকভাবে মূল্যায়িত হন না। সমাজের স্বার্থপর মানুষগুলোর ইঁদুর দৌড়ে সাধারণ মানুষ ব্যথিত হয়, হূদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, দুঃখ পায়।
আজ যিনি অর্থশালী কিংবা দরিদ্র সবারই পরিণতি এক; মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত। বয়স শেষ হয়ে যায় চাওয়া-পাওয়ার দৌড়ে কিন্তু জীবনযুদ্ধে সবকিছু ফেলে, যা অর্জিত হয় তার সিকি ভাগও ভোগ করা হয় না। একসময় ক্ষান্ত হয় এই ছুটে চলা জীবন—যে জীবনের হয় না কোনো সমীকরণ। টাকা হলো টাকা ভোগের ক্ষমতা হারালো। জীবন যে এত দ্রুত ফুরাবে বোঝার আগেই বার্ধক্য চলে এলো। সৃষ্টিকর্তা যদি আপনাকে সম্পত্শালী করে থাকেন, পদমর্যাদা দিয়ে থাকেন, তবে যাকে দেননি তার পাশে দাঁড়ালে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই খুশি হন। তবে জীবনধারায় সব শ্রেণির মানুষের সুখ-দুঃখের সব সূচকের গড় হয়তো-বা সমান। যাদের অর্থ আছে তাদের অনেকে ইচ্ছেমতো খেতে পারে না, এসির মধ্যে বাস করেও তাদের ঘুম হয় না; কিন্তু যাদের অর্থ নেই তাদের অধিকাংশই যা পায় তার সবটুকু খেতে পারে, এসিতে না ঘুমালেও গরমে তাদের সুখনিদ্রা হয়। সমাজে স্বার্থপর মানুষেরও অভাব নেই, নিঃস্বার্থ আলোকিত মানুষও আছেন অনেক। কারো ইতিবাচক ভাবনা সমাজকে আলোকিত করে, কেউ তার সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় মানুষের কল্যাণে, আবার কারো নেতিবাচক ভাবনা সমাজকে পশ্চাদ্গামী করে। পৃথিবীতে সব অর্জনই ক্ষণস্থায়ী, তাই স্বার্থ যেন স্বার্থপরতা না হয়, সহমর্মিতা যেন হারিয়ে না যায়।
n লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহানাবাদ
