দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় লঙ্কাকাণ্ড!

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫৫

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ঘটিয়া চলিয়াছে লঙ্কাকাণ্ড। বর্তমানে সেখানে বিরাজ করিতেছে চরম রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট। গত বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে এমপিদের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধ ও বিভিন্ন জিনিস ছুড়িয়া মারিবার ঘটনা ঘটে। বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের একদিন পর দেশটি এখন অনেকটাই সরকারবিহীন। প্রেসিডেন্ট স্পিকারের সমালোচনা করিয়া এই অনাস্থা ভোট প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন।

শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক সংকট ও অচলাবস্থা শুরু হয় গত ২৬ অক্টোবর। এই দিন প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা হঠাত্ প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহকে বরখাস্ত করিয়া বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি রাজাপাকসেকে তাহার স্থলাভিষিক্ত করেন এবং পরদিনই পার্লামেন্ট স্থগিত ঘোষণা করেন। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পার্লামেন্টের অধিবেশন আবার শুরু হইলে রাজাপাকসে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে জয়ী হইতে পারিবেন না দেখিয়া প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভাঙিয়া দিয়া আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সমপ্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়া দিলে বিক্রমসিংহ শিবির উল্লসিত হয়। উল্লেখ্য, আঞ্চলিক শক্তিধর দুইটি বৃহত্ দেশের প্রভাব বিস্তার ও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে শ্রীলঙ্কায় একের পর এক রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ হইতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। তাহার যবনিকাপাত কখন ঘটিবে তাহা কেহ জানেন না। মালদ্বীপে জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংকটের অবসান না হইতেই আমরা শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক উত্তাপ লক্ষ্য করিলাম। ইহার আগে নেপাল ও ভুটান নিয়া যে উত্তেজনা ছিল, ইহাকে তাহার বাহিরে দেখা অসম্ভব।

বহু মেরুকরণের যুগে ও নব্বই দশক হইতে উত্থিত বিশ্বের একক পরাশক্তির সামপ্রতিক ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবের সুযোগে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মাথাচাড়া দিয়া উঠাটা অস্বাভাবিক নহে। আজিকার বিশ্ব অশান্তি ও অস্থিরতার সহিত তাহার যে কোনো না কোনো যোগসূত্র আছে, তাহা অনস্বীকার্য। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক বিভেদের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্র বন্দরের লিজ প্রদান নিয়া টানাপোড়েন। ইহাতেই এক দশক পর তত্কালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের পতন হয়। তাহার আমলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে সেই হামবানতোতা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী একটি আঞ্চলিক শক্তি। ইহার পর সেই এলাকায় পারমাণবিক সাবমেরিন দেখা যায় বলিয়া জানা যায়। এই বন্দরটি লইয়া যে চুক্তি হয়, তাহা শ্রীলঙ্কাকে শেষপর্যন্ত ঋণের ফাঁদে ফেলিয়া দিয়াছে এমন কথাও চাউর আছে।

মূলত জলরাজ্যে বড় মাছ ছোট মাছকে আকর্ষণ করে। গ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সূর্যও তাহার গ্রহগুলিকে আকর্ষণ করে। যদি এই শক্তি না থাকিত, তাহা হইলে একটা গ্রহের সহিত অন্য গ্রহ নিজস্ব দূরত্বে ঘূর্ণায়মান থাকিতে পারিত না, ছিটকাইয়া পড়িত। তাহা ছাড়া নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের প্রথমাংশে বলা আছে যে, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই ক্ষেত্রে তুলনামূলক ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপর বৃহত্ বস্তুকণার আকর্ষণবল অধিক থাকে। ইহার দৃষ্টান্ত ভূরাজনীতিতেও দেখা যায়। অর্থাত্ বড় দেশ ছোট দেশকে আকর্ষণ করে। আবার অনেক কিছু পরিবর্তন করা গেলেও কখনো প্রতিবেশী বদল করা যায় না। সুতরাং শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকট উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলির জন্য শিক্ষণীয় বটে।