ইরানে ১৯৭৯ সালে সফল ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান-মার্কিন উষ্ণ সম্পর্ক শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। কারণ ক্ষমতার হাত বদল। ইরানের শাহানশাহ রেজা শাহ পাহলভী ইসলামী বিপ্লবের পর ক্ষমতাচ্যুত হন। মধ্যপ্রাচ্যে তখন শাহানশাহ ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সমসাময়িক পৃথিবীতে সম্ভবত ইরানি বিপ্লব মার্কিনিদের সবচেয়ে বেশি নাকানি চুবানি খাইয়েছে। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর নতুন বিপ্লবীরা তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়। সেখানে তারা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন অবরোধ করে রাখে। নরমপন্থী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড অনেকবার গোপনে ও প্রকাশ্যে অভিযান পরিচালনা করেও তাদের মুক্ত করতে পারেননি।
ইরান মার্কিন সম্পর্কের তিক্ততার বিষয়টি উল্লিখিত হলো বর্তমানকে অনুধাবনের প্রয়োজনে। আমরা সবসময় বলে থাকি ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’। বিগত ৪০ বছর ধরে ইরান-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগোনো-পিছানো হয়নি, তা নয়। বিপ্লবের পর পরই ইরানের শাসনতান্ত্রিক নেতা মেহেদি বাজারগান ইরান-মার্কিন সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে ছিলেন। পরবর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান বনীসদরও একই মত পোষণ করতেন। চরমপন্থীদের উত্পাতে উভয়ই ক্ষমতাচ্যুত হন। বিগত সময়গুলোতে শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। সম্ভবত কেউ ঝুঁকি নিতে চায়নি। আর বিপ্লবের উষ্ণতা তখনও হ্রাস পায়নি। আলী আকবর হাসিমি রাফসানজানির সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। তবে আদর্শিক বৈপরীত্যের কারণে ইরান-মার্কিন সম্পর্ক শীতলতা অতিক্রম করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতকে ভুলতে পারেনি। তারা সবসময় ইরানকে শত্রু রাষ্ট্র বলেই গণ্য করেছে। আর ইরান ‘বড় শয়তান’ বলে যুক্তরাষ্ট্রকে গালি দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করার গোপন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রয়াসকে তারা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করে আসছে। এ অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পাশ্চাত্যের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে অবরোধ আরোপ করে। ইরান অবরোধে নিঃশেষ হয়ে না গেলেও অসুবিধার সম্মুখীন হয়। ইরান কূটনৈতিকভাবে অবরোধ প্রত্যাহারের চেষ্টা করতে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশদ্বয়ের আমলে বিষয়টি পাত্তা পায়নি। বরং যুদ্ধাংদেহী মনোভাব প্রকাশিত হয়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে যুদ্ধের বদলে শান্তিপূর্ণভাবে ইরান সমস্যার সমাধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টকর কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার পর অবশেষে ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সাথে ইরানের একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধুমাত্র শান্তির জন্য—এ প্রতিশ্রুতি দেয়। বলা যায়, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা থেকে ফিরে আসে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ‘সম্মিলিত সার্বিক কার্যকর পদক্ষেপ- জেসিপিওএ’ এর আওতায় এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। ছয় বিশ্বশক্তি—রাশিয়া, চীন, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথভাবে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশন-আইএইএ চুক্তির তত্ত্বাবধান করে। কমিশন নিশ্চিত করে যে, ইরান অক্ষরে অক্ষরে চুক্তির শর্তাবলী পালন করেছে। এই সমঝোতার আলোকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে ওঠে যাওয়ার কথা। ধীরগতিতে অবরোধ ওঠে যাচ্ছিল। কিন্তু বিধি বাম। চুক্তির বাস্তবায়ন যখন শেষ পর্যায়ে তখন ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি ইরান-মার্কিন চুক্তি বাতিলের কথা বলেন।
ইতোপূর্বে আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের চেয়ে ট্রাম্প ঘোষিত অবরোধ সর্বাত্মক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বছরের মে মাসে রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় ইরান-মার্কিন চুক্তি এককভাবে বাতিল করেন। বৈশ্বিক অন্যান্য শক্তির সাথে এ ব্যাপারে তিনি পূর্বাপর আলোচনা করতে অস্বীকার করেন। ট্রাম্প ঘোষিত এই অবরোধ সর্বাত্মক এবং আক্রমণাত্মক। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কেইথ জোনস এই অবরোধকে ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে মনে করেন। অবরোধে প্রথমত ইরানের তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক লেনদেন তথা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ইরানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তৃতীয়ত, ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধ করা হয়েছে। আরোপিত বিধি-নিষেধ অনুযায়ী ইরান মেশিনারি, খুচরা যন্ত্রপাতি এমনকি খাদ্যদ্রব্য ও ঔষধাদি ক্রয় করতে পারবে না। ঘোষিত মার্কিন নীতিমালায় বলা হয় যে, ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান—সরকারি বা বেসরকারি কারো সাথেই কোনোক্রমেই অন্য কোনো দেশের ব্যক্তি, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা লেনদেন করতে পারবে না। এছাড়া ইরানের প্রতি বন্ধুপ্রতিম কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্রের সাথেও কেউ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। যদি এরকম সম্পর্ক প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একান্নতম প্রদেশ বলে কথিত ইসরায়েল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ ঘোষণাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিনন্দিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু অনেক আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপে খুশি সৌদি আরব ও তার মিত্ররা। অবরোধ ঘোষণার পর সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের তেলের ঘাটতি পূরণে নিজেদের তেল উত্পাদন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই একতরফা ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়েছে তাদের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো। গত ২ অক্টোবর বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরান-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির প্রতি তাদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। ঘোষণায় তারা বলেন, ইরানের সাথে ইউরোপের আইনানুগ বাণিজ্য নিরাপত্তা দিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের এ সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ গৃহীত ২২৩১ নম্বর প্রস্তাবের পরিপূরক। তারা ইরানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং মার্কিন অবরোধকে অগ্রাহ্য করে তেল-গ্যাস আমদানি-রপ্তানির ব্যবস্থা বজায় রাখবে। তারা আরো ঘোষণা করে যে, চীন ও রাশিয়ার সাথে যোগাযোগ করে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে। ঐ বিবৃতিতে মার্কিন হুমকির মোকাবিলায় ইউরোপের বাণিজ্য রক্ষায় সম্মিলিত এবং আইনানুগ অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রয়োজনে পৃথক বাণিজ্য জাহাজ এবং মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ইউরো বা অন্য কোনো মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা বলা হয়।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ তথা শক্তিধর অর্থনৈতিক রাষ্ট্র। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মত প্রাতিষ্ঠানিক প্রাধান্য তাদের রয়েছে। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানি, সামরিক-বেসামরিক কর্পোরেট সংস্থা এবং নানা ধরনের ব্যবস্থার অধীনে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত। সুতরাং ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা তার জন্য কঠিন কোনো বিষয় নয়। বাণিজ্যিক পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইপস এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রদত্ত বিবৃতিতে ইউরোপের যে ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছে, আসলে বাস্তব অবস্থা তার থেকে ভিন্নতর। ২০১৯ সালের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতির কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাবে না। ইউরোপের বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক অসুবিধাসমূহ ব্যাপক। তারা মার্কিন হুমকিকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা মার্কিনীদের কাছে নতি স্বীকার করে। শুধুমাত্র ইরানের বিষয় নয়, সামগ্রিকভাবেও ইউরোপের দেশগুলো মূলত মার্কিন অর্থনীতির মুখাপেক্ষী। গত মাসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জেন ক্লথ জাকার ডলারের পরিবর্তে ইউরোকে বিশ্ব অর্থনীতির বাহন হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান। ফরাসি অর্থনীতিবিদ ব্রুনো লি মেরি বলেছেন, ইরান সংকট ইউরোপের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপ স্বাধীন কিছু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারে, যাতে সে যেকোনো দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তা এলিজাবেথ রোজেনবার্গ মন্তব্য করেছেন যে, ট্রাম্পের একক নীতি ওয়াশিংটনকে উপেক্ষা করে ইউরোপকে বাধ্য করছে চীন ও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের ইসলামী শাসকদের পতন চায়। এতে মুসলিম বিশ্বের আর এক সম্মানীয় শক্তি সৌদি আরবের শক্ত সমর্থন রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, সাম্প্রতিক আরোপিত অবরোধে বরং মৌলবাদি ইসলামী শক্তি আরো দৃঢ়তা পাচ্ছে। বিগত চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকায় ফলে এদের প্রতি মানুষের বিরাগ সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কয়েক মাস আগেও সেখানে সরকার বিরোধী আন্দোলন পরিলক্ষিত হয়েছে। এখন ইরানের ক্ষমতাসীনরা মার্কিন অবরোধকে তাদের ক্ষমতা সংহতকরণে ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। এ মাসের ৪ তারিখ ছিল ইরান কর্তৃক মার্কিন দূতাবাসের কর্মচারীদের জিম্মি করার চল্লিশতম বার্ষিকী। এ উপলক্ষে আহূত মিছিলে লক্ষ লক্ষ ইরানি অংশগ্রহণ করে। সরকার বিরোধী আন্দোলন ছাপিয়ে তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’। এটি মার্কিন তথা ট্রাম্প কূটনীতির ফলাফল। শক্তি প্রয়োগ বা নিপীড়নে জনগণ তুষ্ট না হয়ে রুষ্ট হয়।
n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
