‘মনোরম করা আছে কামনা অপার/মানুষের কাছে যাহা অধিক চাওয়ার/সন্তান নারী আর সোনা ও রূপার/অশ্ব পশুরাজি ক্ষেত ও খামার’। (কাব্যানুবাদ, সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪) মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের এ বাণীতে মানবপ্রবৃত্তির স্বাভাবিকতা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের দুরন্ত বাসনার সর্বগ্রাসী জিহ্বা শান্তির পৃথিবীতে কখনো বা অশান্তির জ্বলন্ত শিখায় ফুঁক দেয়। কিন্তু জমিজমা বাড়ি-গাড়ি সবই তো মহান আল্লাহর দান। ভূমিহীন যারা, তারাও এ মাটির পৃথিবীতেই বিচরণ করে আবার ভূমির দাবি ও দখলের জন্য আপনজনের ভূমিকায় অন্তরের নীরব উচ্চারণ—‘মাটি কেন দুই ভাগ হয় না’! অথচ মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইন্নাল আরদা লিল্লাহ... নিশ্চয়ই ভূমির মালিক আল্লাহ, তিনি তার বান্দাগণের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকার দান করেন’।
মানবিক সম্পর্কের স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ হয়ে ওঠে অন্ধ এবং চায় ছলে-বলে, কলে-কৌশলে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে। কেননা, প্রাচুর্যের মোহ মানুষের সহজাত—‘পরিতাপ প্রত্যেক পশ্চাতে নিন্দুকের জন্য, যে সম্পদ জমা করে, গণনা করে এবং ধারণা করে এটাই তাকে অমর করবে’ (সুরা হুমাযাহ্, আয়াত: ০১-০৩)। প্রাচুর্যের মোহ যতই মানুষকে অস্থির রাখুক না কেন সব সম্পদের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, মানুষের মালিকানা হলো সাময়িক ও সীমিত। আল কোরআনের ভাষায়—‘আল্লাহই সব জিনিস সৃষ্টি করেছেন এবং অতঃপর এর ব্যবহার ও প্রয়োগের জন্য বিধি-বিধানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন’ (সুরা ত্বা-হা, আয়াত: ৫০)।
সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সবার কাম্য চাহিদা পূরণ করা ইসলামের শাশ্বত নীতি। একের ভোগাকাঙ্ক্ষায় অন্যের ভোগান্তি ইসলাম সমর্থন করে না। তাই প্রিয় নবি (স) বলেন, ‘যার ঘর নেই এ দুনিয়ায় সে ঘর পাবে, যার সম্পদ নেই সে সম্পদ পাবে কিন্তু যার বিবেক নেই, সে সম্পদ জমা করবে’ (আহমদ)। তিনি (স) আরো বলেন—‘থাকার জন্য একটি ঘর, লজ্জা নিবারণের জন্য এক খণ্ড বস্ত্র, ক্ষুধা নিবারণের জন্য কয়েকটি রুটি, পানি পানের জন্য একটি পাত্র—এর অতিরিক্ত কোনো সম্পদের অধিকারী হওয়ার হক আদম সন্তানের নেই’ (তিরমিজি)।
সম্পদ বণ্টনে ইসলামের উত্তরাধিকার নীতি খুবই কার্যকর। মৃত ব্যক্তির ঋণ, ওয়াসিয়াত ও দাফনের খরচের পর অবশিষ্ট সম্পদ উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে বণ্টনের জন্য সুরা নিসার ৭, ১২, ১৭৭ নম্বর আয়াতসহ আল কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আবার জমিজমা ভোগদখলহীন ফেলে রাখা অথবা অন্যায়ভাবে অন্যের জমি দখলে রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই (আল্লাহ) ভূপৃষ্ঠকে তোমাদের জীবিকা অর্জনের জন্য নরম ও অনুকূল করে দিয়েছেন...’ (সুরা মুলক্, আয়াত: ১৫) । অন্যদিকে অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রিয় নবির (স) কঠোর উচ্চারণ—‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অপরের এক বিঘত্ জমি আত্মসাত্ করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তবক জমি ঝুলিয়ে দেওয়া হবে’ (বুখারি-মুসলিম)।
বস্তুত বাড়ি-গাড়ি জমিজমার মালিক হওয়া দূষণীয় নয়। শুধু মনে রাখতে হবে, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার সব ক্রিয়াকর্মের ভিত্তি বা জীবননাট্যের মঞ্চ হলো মাটি বা জমি আর মাটিতেই তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। মহান আল্লাহ্ বলেন—‘মাটি হতে তোমাদের সৃষ্টি করিয়া/মাটিতেই তোমাদের নিব ফিরাইয়া/মাটি হতে পুনরায় আনবো বের করিয়া’ (কাব্যানুবাদ, সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ৫৫)। আর সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর রেঙ্গুনে নির্বাসিত দিনগুলোতে তার কবরের জন্য যে স্মৃতি ফলক রচনা করে ছিলেন তা হলো: ‘কিয়া বদ নসিব হ্যায় জাফর/ দু’গজ জমিন ভি না মিলি— হিন্দুস্তাঁ পর।’ অর্থাত্—‘কতই না দুর্ভাগ্য জাফর তোমার/ভারতের বুকে না মিলিলো—/মাটি (দু’গজ) মাত্র হাত চার’।
lলেখক :বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ,
কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর
