কবিতার একটি দৈনিকের নাম হতে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ২০:৩৯

বাংলা কবিতায় তাঁর আগমন অনেকটা সন্তের মতো। আর তাঁর কবিতা নদীর ঢেউয়ের ছন্দের সঙ্গেই যেন তুলনীয়। জলে বাঁধা অর্কেস্ট্রা যেন এক-একটি কবিতা! পরিমিত বোধে জমাট কান্নার সারাংশ হয়ে ওঠে কখনো কখনো কবিতার সত্তা। যার ভিত্তি মজবুত, বহুর সুষমায় অনন্য, ব্যাপ্তিময়। বিষাদের ঘন নীলে ফুলের রূপ নিয়ে আসে অনুভূতিগুচ্ছ, করে আহত, আচ্ছন্ন, নিঃস্ব। যেখানে নেই অতি আবেগ বা শব্দের অপচয়। প্রতিটি শব্দ নিয়তির মতো পরিচালিত। সেখানে কবি তাঁর একাকীত্বের মঞ্চে থেকে শুনিয়ে যান তাঁর জখম হওয়া মানবাত্মার চিত্কার, সংযত স্বরে। কখনো হূদয় আর বুদ্ধির সমন্বিত উচ্চারণে যেন তিনি বলে যান গোপন তৃষ্ণার কথা। হ্যাঁ কথাগুলো কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশেই বলা। ১৯৩৩ সালের ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহরুতে তাঁর জন্ম। জীবনানন্দ উত্তর যুগে বাংলা কবিতার একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে যাঁকে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া ১৯৬১ সালের হাংরি আন্দোলনে অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি হিসেবেও ছিল তাঁর অবস্থান। কবিতাকে নতুন ভাষা পরিয়ে জরাজীর্ণ, প্রচল ভাষাকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবল ঔদ্ধত্য যেন তাঁকেই মানায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায় হচ্ছেন সবার জীবনে কবিতার প্রথম প্রেম। কারণ শক্তির কবিতা পড়ে তাঁর প্রেমে পড়েননি—এমন নজির খুব কম। একজন জাত কবির যে যে বৈশিষ্ট্য থাকে—শক্তির মধ্যে তার সবগুলোই বিদ্যমান। এরকমও শ্রুতি আছে যে—তিনি এক বসাতে দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলতে পারতেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’ ৬৩২ লাইনের এই সুদীর্ঘ কবিতাটিও তিনি একদিনেই লিখেছিলেন। যাঁর ভেতর সারাক্ষণ শব্দের বুদ্বুদ, অনুভূতিকে ভাষা দেওয়ার প্রবল মনস্কাম—তিনি তো যেকোনো মুহূর্তেই কবিতা লিখে উঠতে পারবেন—এটাই স্বাভাবিক। কবিতার একটি দৈনিকের নাম হতে পারে শক্তি চট্টোপাধ্যায়। প্রথম দিকে এই কবি উপন্যাসকেই বেছে নিয়েছিলেন জীবিকা নির্বাহের পথ হিসেবে। লিখেও ছিলেন কিছু ব্যর্থ প্রেমের উপন্যাস। ‘কুয়োতলা’ তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস। যা অনেকের সুনজরে পড়েনি। আসেনি পাদপ্রদীপের আলোয়। এরপর আরো কয়েকটি প্রেমের উপন্যাস লিখে দাঁড়াবার চেষ্টা থাকলেও ভাগ্য ছিল বিমুখ। তবে এও সত্যি, কবিদের উপন্যাস তথাকথিত ধারা ভেঙে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়াস থাকে বলে অনেকে এই নতুন ফর্মকে নিতে পারেন না। জীবনানন্দ দাশও উপন্যাস লিখেছিলেন। কিন্তু সেগুলো আলোচনায় আসেনি, যতটা তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়। কমিউনিস্ট ভাবধারার সাথে একাত্ম হয়ে তিনি অনেকদিন নতুন দেশ বিনির্মাণের স্বপ্নও দেখেছিলেন। একজন কবি প্রথাগত সমাজের খোল-নলচে পালটে দিতে সজাগ থাকেন সবসময়ই এবং অচলায়তন ভেঙে প্রবাহিত করতে চান নতুন দিনের আলো। শক্তিও চেয়েছেন এমনটিই। সুকান্তের মতো তিনিও হয়তো পূর্ণিমার চাঁদকে ক্ষুধার্তের রুটির মতোই দেখেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় নামের আড়ালে তাঁর আরো দুটো ছদ্মনাম আছে—যেটা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না! রূপচাঁদ পক্ষী ও স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার। রূপচাঁদ পক্ষী নামে তিনি পত্রিকার পাতায় গদ্য লিখতেন। কবি নামের ওপর যাতে কোনো প্রভাব না পড়ে, সে জন্যই হয়তো এই ছদ্মনামের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সঙ্গেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা জানা যায়। সুনীল-শক্তি এই দুটো নাম একসাথেই উচ্চারিত হতো একসময়। এখনো হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ এলেই আপনা থেকেই চলে আসে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম। এটা হয়েছে তাঁদের বোহিমিয়ান জীবনের বন্ধুত্বের কারণে। ছকে বাঁধা জীবনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেই যেন আয়নায় একজনের মুখ আরেকজন দেখতে পেয়েছিলেন। তবে সুনীলের কবিতা দিয়ে শুরু হলেও তিনি উপন্যাস লিখে তৈরি করতে পেরেছেন বৃহত্ পাঠকগোষ্ঠী। কিংবা এও বলা চলে সুনীলের দুটো মুকুট—একটি কবির, অন্যটি ঔপন্যাসিকের। আর শক্তি উপন্যাস লিখে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত থিতু হলেন কবিতায়। বোঝা গেল কবিতাই তাঁর আপন ঠিকানা, আশ্রম, প্রতিবাদ, প্রেম, শৈশব, প্রতিশোধ, দুঃখ, মান-অভিমান, জয়-পরাজয়, সাহস আরো যত রূপ আছে, বর্ণনাতীত শব্দ আছে, সবকিছুর ভেতর এক সর্বনাশা কবিতা তাঁকে অজগরের মতো ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে। ওখান থেকে তিনি আর বেরোতে পারেননি। কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ‘ক্লারিয়ন’ নামের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি ‘ভারবি’ নামের একটি প্রকাশনা সংস্থায় যোগ দেন। কিন্তু আমৃত্যু আপসহীন বেপরোয়া জীবনের প্রতিধ্বনি যাঁর প্রতি কদমে বেজে উঠেছে—তিনি চাকরিজীবনেও ওভাবে স্থির হতে পারেননি। নিঃসঙ্গতার এলিজি হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা এভাবে—

 

ভালোবাসা পেলে সব লন্ডভন্ড করে চলে যাবো

যেদিকে দুচোখ যায়—যেতে তার খুশি লাগে খুব

ভালোবাসা পেলে আমি কেন পায়সান্ন খাবো

যা খায় গরীবে—তাই খাবো বহুদিন যত্ন করে।

কিংবা

 

চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে

রেখেছিলাম, আজই সময় হলো—

লিখিও উহা ফেরত চাহো কিনা?

 

অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছো

তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো

লিখিও উহা ফেরত চাহো কিনা।

 

কমিউনিস্টদের তখন পুলিশ পেলেই গ্রেফতার করছে। ধারণা করা হয় সে মুহূর্তে লেখা তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘অবনী বাড়ি আছো?’

 

অবনী বাড়ি আছো?

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া

কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী বাড়ি আছো?’

 

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস

এখানে মেঘ গাভির মতো চড়ে

পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস

দুয়ার চেপে ধরে—

‘অবনী বাড়ি আছো?’

 

আধেক নীল হূদয়ে দূরগামী

ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি

সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী বাড়ি আছো?’

 

‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’, ‘ঈশ্বর থাকেন জলে’, ‘সোনার মাছি খুন করেছি’, ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’। শক্তির লেখা এই বইগুলো আজ বাংলাসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। একজন কবি কীভাবে আকণ্ঠ ডুবে যেতে থাকেন কবিতার পদ্মপুকুরে, তার সাক্ষ্য দিতে এই বইগুলি নিঝুম অন্ধকারেও যেন জ্বলে ওঠে নক্ষত্রের মতো! ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ কবিতার আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে শান্তিনিকেতনে চিরনিদ্রায় শায়িত হন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

 

[কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত রূপ]