বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বাড়ি ছিল জেলখানা। তাঁর মন না চাইলেও সেখানে থাকতে হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়ে। দেশকে ভালোবাসা, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা—এসব ছিল তাঁর অপরাধ। তাই সে সময় পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে ভয় পেয়ে যখন খুশি তখন জেলে পুরে রাখত।
রাজবন্দি ছিলেন তিনি। জেলখানার লাল দেয়াল। স্যাঁতসেঁতে রুম। অনেক ওপরে ছাদের কাছাকাছি জানালা। রুমে আলো বাতাস খুব কম। আবছায়া অন্ধকার। দিনের বেলাতেও লাইট টিম টিম করে জ্বলত। সেই আলোতে খুব কষ্ট করে বই পত্রিকা পড়তেন তিনি।
কারাগারের সেলে কথা বলার মতো কোনো লোক ছিল না। নিজের সাথে একা একা কথা বলতেন। কখনো একাই শব্দ করে হেসে উঠতেন। আবার কখনো হাওয়াশূন্য বেলুনের মতো চুপসে যেতেন। তাঁর বুকের লুকানো দুঃখগুলো গুমরে কেঁদে উঠত। তিনি ভাবনার ঢেউয়ে দোল খেতে খেতে হারিয়ে যেতেন। এক-একটা দিন ছিল সেই সময়ে এক-একটা বছরের সমান।
কারাগারে তাঁর বিশ নম্বর সেলের সামনে উঁচু দেয়ালঘেরা অল্প জায়গা ছিল। সেখানে তিন-চারটি আমগাছ আগে থেকেই ছিল। বঙ্গবন্ধু গাছগুলোর খুব যত্ন করতেন। সকালবেলা নিয়মিত পানি দিতেন। আগাছা পরিষ্কার করতেন। সেই অল্প জায়গাতেই ফুল ও সবজির বাগান করেছিলেন। নিজহাতে বাগানের যত্ন নিতেন। বাইরে থেকে দূর্বাঘাস এনে বুনেছিলেন। দু বেলা পানি দিতেন ঘাসে। অল্পদিনের মধ্যে ঘাসগুলো সজীব হয়ে উঠল। বঙ্গবন্ধুর মন ভরে উঠত ঘন সবুজ নরম তুলতুলে ঘাসের কার্পেট দেখে। রোজ সকালে সেই নরম ঘাসের কার্পেটে হাঁটতেন।
১৯৫৮ সালের শীতের সকাল। বঙ্গবন্ধু নাস্তা খাওয়া শেষ করে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে মিষ্টি রোদে বাগানে বসে বই পড়ছিলেন। চোখে পুরো লেন্সের চশমা, মুখে পাইপ, খুব আয়েস করে পাইপ টানতেন।
দশটা বাজতেই মন ছুটে যেত অন্য কোনোখানে। তাঁর চোখ কী যেন খুঁজত। অস্থির হয়ে যেতেন তিনি। অপেক্ষা খুব কষ্ট দিত তাঁকে। কারাগারের জীবন মানেই অপেক্ষা।
হঠাত্ বঙ্গবন্ধুর চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক দিলো। তিনি মনে মনে হয়তো বলে উঠলেন—ইউরেকা। মানে পেয়েছি। তাঁর চোখ আটকে গেল বেগুনগাছের ডালে। রোজকার মতো দুটি ছোট্ট হলদে পাখি বেগুনগাছের ডালে বসে দোল খাচ্ছে আর ইতিউতি তাকাচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে পাখি দুটি বঙ্গবন্ধুকে যেন দেখতে আসে। ওদের সাথে যেন তাঁর অনেকদিনের পরিচয়। আলাপচারিতা। ওরা রোজ খবর নেয় তাঁর। বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন সকাল ১০টা বাজলেই ওদের দেখা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতেন। পাখি দুটির সাথে তাঁর ভীষণ ভাব হয়ে যায়। ওদের সাথে অনেক কথা বলতেন তিনি। হলদে পাখি দুটি পালক ঝাঁপটাত। একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে আদর করে দিত। খাবার খুঁজতে খুঁজতে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে চলে আসত ওরা। মোটেই ভয় পেত না তাঁকে। বঙ্গবন্ধুকে ওরা বন্ধু ভাবতো। তিনি পাখি দুটি দেখতেন আর ভাবতেন—ছোট্ট পাখি দুটির কত স্বাধীনতা, আর তাঁর বেলায়!
১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর প্রায় শেষ। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে মুক্তি পেলেন। এরই মধ্যে হলদে পাখি দুটির কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন। পাখি দুটি রোজ ১০টায় আসে। এদিক ওদিক তাকায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নেই। প্রিয় বন্ধুর মুখ না দেখে মন খারাপ করে ওরা ফিরে যায়।
বছর দুয়েক পর বঙ্গবন্ধু আবার জেলে আসলেন। সেই ২০ নম্বর সেলে। এখানে তিনি আগেই থেকে গেছেন। জেলখানার সেলে তাঁর চোখে ঘুম নেই। তিনি সারারাত এপাশ ওপাশ করেন। কখন সকাল হবে। কখন ১০টা বাজবে। সেই অপেক্ষায় ছটফট করেন তিনি। বন্ধুদের একপলক দেখার জন্যে মন আকুলিবিকুলি করে। তাঁর মন কাঁদে। পরদিন সকাল ১০টার আগেই তিনি বাগানে আসেন। আবার অপেক্ষার পালা। এরই মধ্যে তিনি খুশিতে টগবগ করে উঠলেন। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। হলদে পাখি দুটি ফুড়ুত্ করে উড়ে এসে বসল আমের ডালে। বঙ্গবন্ধুর চোখের ফ্রেমে আটকে গেল সে দৃশ্য।
তিনি কয়েক পা এগিয়ে আমগাছের কাছে গেলেন। পাখি দুটি চমকে উঠল। কিচির মিচির শব্দ করে উড়াল দিতে গিয়ে আবার থেমে গেল।
বঙ্গবন্ধু পাখি দুটিকে খুব ভালো করে দেখলেন। একইরকম কিন্তু এরা সেই পাখি নয়। এই পাখি দুটি আগের পাখি দুটির চেয়ে আকারে একটু ছোট। তিনি ভাবলেন, ওরা হয়তো মরে গেছে না হয় প্রিয় বন্ধুকে দেখতে না পেয়ে অন্য কোথাও অভিমানে চলে গেছে। বঙ্গবন্ধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরা হয়তো ওদেরই বাচ্চা। স্বজন হারানোর ব্যথা তাঁর বুকে চিনচিন করে ওঠে। তিনি মনে মনে পাখি দুটির কিচিরমিচির ডাকের মানে খুঁজে ফেরেন। তবে ওরা কি কোনো শোকবার্তা দিতে এসেছে? বাচ্চা দুটির দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে ভেসে ওঠে রাসেলের মুখ। ও যেন পাখিরূপে আধো আধো বলছে, ‘বাবা বালি চলো’। বঙ্গবন্ধুর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। কয়েক ফোঁটা পানি নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। হলদে পাখি দুটি আর রাসেলের মায়াময় মুখ একাকার হয়ে যায় তাঁর চোখে।
