বান্দরবানের এক টুকরো সৌন্দর্য!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৯

কাজী কাউছার হামিদ

 

সকাল ৮টায় যাত্রা শুরু করলাম বান্দরবানের রুমা বাজারের উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে ছিল বাগা লেকে রাত কাটানোর, কিন্তু ৩টা বেজে যাওয়ার কারণে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল না। পরের দিন আমরা অনুমতি নিয়ে রওনা দিই, উদ্দেশ্য কমলার বাজার। সেখান থেকে ট্র্যাকিং করে যেতে হয় বগা লেক। কমলা বাজার পর্যন্ত যেতে লাগে চান্দের গাড়ি। প্রায় ২ ঘণ্টার ধুলোমিশ্রিত যাত্রা শেষে পৌঁছালাম কমলা বাজার।

এবার পাহাড়ে ওঠার পালা। বগা লেকে ওঠার পথটা বেশ খাঁড়া। তাই আমরা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠলাম। কিন্তু মনে সাহস নিয়ে এলাম দমে গেলে চলবে না। একটু করে বিশ্রাম আর পানিতে মুখ ভিজিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় ৩০ মিনিট ট্র্যাকিং শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম বগা লেক।

ক্লান্তিভরা চোখ জুড়িয়ে গেল মুহূর্তে। সমুদ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় ১৫ একর জায়গার এ রকম লেক আর কোথায় মিলবে! এই লেকটি তৈরি হয়েছিল একটি মৃত আগ্নেয়গিরি পানি চুয়ে। তাই একে ড্রাগন লেকও বলা হয়। বগা লেক পৌঁছে আর্মির ক্যাম্পে রিপোর্ট শেষে উঠে পড়লাম কটেজে। এগুলো গাইডই ম্যানেজ করে দিলেন। কটেজে ব্যাগগুলো রেখে আমরা লাফিয়ে পড়লাম লেকের পানিতে। স্বচ্ছ আর ঠাণ্ডা পানিতে নিজেকে শীতল করতে কার না ভালো লাগে। বগা লেকের রাতের সৌন্দর্য না দেখলে তো অনেককিছুই মিস হয়ে যাবে। আর যদি সেদিন পূর্ণিমা হয় তবে তো আর কথাই নেই। চাঁদের আলোতে বগা লেক যেন নববধূর সাজে সজ্জিত হয়। তাই এটি আর দেখতে ভুল করলাম না।

পরদিন সকালেই শুরু হলো আমাদের কেওক্রাডং জয়ের যাত্রা। কেওক্রাডং যাওয়ার পথে চিংড়ি ঝরনা চোখে পড়বে। প্রায় ২ ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছালাম দার্জিলিংপাড়া। এ পাড়ায় দার্জিলিংয়ের মতো ঠাণ্ডা দেখে হয়তো এমন নামকরণ করা হয়েছে। গ্রামটি দেখতেও ছবির মতো সুন্দর। এখানে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে শুরু করলাম কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশ্যে শেষ যাত্রা। আরো প্রায় ৩০ মিনিট ট্র্যাকিং শেষে পা রাখলাম কেওক্রাডংয়ে। কেওক্রাডং নামটি এসেছে মারমা ভাষা থেকে। মারমা ভাষায় ‘কেও’ মানে পাথর, ‘ক্রা’ মানে পাহাড় আর ‘ডং’ মানে সবচেয়ে উঁচু। অর্থাত্ কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। কেওক্রাডংয়ে পা রাখাটা হতে পারে আপনার জীবনের অন্যতম সেরা একটি মুহূর্ত।

বাংলাদেশের পঞ্চম সর্বোচ্চ চূড়া হওয়ায় একদিকে সূর্যের অস্ত যাওয়া আর অন্যদিকে চাঁদের ঊষা একসাথেই দেখা যায়। অনেক সময় ধরে চলে ফটোসেশন ও দেশাত্ববোধক গান পরিবেশন। সন্ধ্যায় সেনা ক্যাম্পে নাম লেখার পর সেনা কমান্ডার আমাদের কেওক্রাডংয়ে থাকার নিয়ম বল দিলেন। এরপর চলে রাত জেগে গান আর পূর্ণিমা রাতের চাঁদ দর্শন।

অধিক উচ্চতার কারণে খুব দ্রতই সূর্য মামা জেগে ওঠে কেওক্রাডংয়ে।

এবার আমাদের ফেরার পালা। কেওক্রাডং আরোহণ করতে প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগলেও নেমে আসতে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মতো লাগলো। পথে চিংড়ি ঝরনায় গোসলটাও সেরে নিলাম।

কেওক্রাডং যেতে হলে অবশ্যই আপনার এনআইডি কার্ড, পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি এবং ৫ বার সেনা ও পুলিশ ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করতে হবে। কোনোভাবেই ভুল তথ্য ক্যাম্পে দেবেন না। রবিবার উপজাতিদের প্রার্থনার দিন। সেক্ষেত্রে খাবারের পানি ও হালকা নাস্তা সঙ্গে রাখতে হবে।

যেভাবে যাবেন:চট্টগ্রাম শহর থেকে বান্দরবানে যাওয়ার অনেক বাস আছে। ভাড়া ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে। বিকেল ৩টার পূর্বে রুমা বাজারে গেলে গাইডসহ সেনা ক্যাম্পের অনুমতি নিয়ে কমলার বাজার হয়ে বগা লেক যাওয়া যাবে। রুমা বাজার, বগা লেক, কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় অনেক হোটেল আছে। জনপ্রতি ভাড়া নেবে ১০০-২০০ টাকা।