বছরের ৩০ নভেম্বরকে ‘জাতীয় আয়কর দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আয়কর দিবসকে সামনে রেখে চলতি বছর(২০১৮) সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলা শুরু হয়েছে গত ১৩ নভেম্বর থেকে, চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাকে উদ্বুদ্ধ করাই এবারের মেলার প্রধান লক্ষ্য। মেলায় নতুন সংযোজন হিসেবে এবার থাকছে ‘ভিজ্যুয়াল পদ্ধতি’তে কর প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে নতুন করদাতারা কর নিবন্ধন নেওয়া থেকে শুরু করে রিটার্ন দাখিলের বিস্তারিত তথ্যও জানতে পারবেন। ২০১০ সালে এ মেলার যাত্রা শুরু হয়। তখন ৬০ হাজার মানুষ কর সেবা নিয়েছিল। আয় হয়েছিল ১১৩ কোটি টাকা। বছর বছর এ মেলার আয় বেড়েছে।
রাজস্ব আয়ের দিক থেকে আয়কর মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। এনবিআরের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের আয়কর মেলায় রেকর্ড সংখ্যক ২ হাজার ২১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকার রাজস্ব আহরণ হয়। বছরটিতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। তবে আশা করা যাচ্ছে যে, আগামীতে প্রবৃদ্ধি আরো বাড়বে। যদিও ২০১৮ সালের মেলা থেকে রাজস্ব আদায়ের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। এবারের মেলায় করদাতাকে উদ্বুদ্ধ করাই প্রাধান্য পেয়েছে। উল্লেখ্য, আয়কর মেলায় গত আট বছরে ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার ১২৫ জন নাগরিক সেবা পেয়েছেন। ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশন, আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণে সহায়তা, রিটার্ন গ্রহণ, কর পরিশোধ এবং কর বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক সেবা গ্রহণের মাধ্যমে এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৫৩২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আট বছরে মেলায় ১১ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৪ জন মানুষ আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। মেলায় নতুন করে ২ লাখ ২৬ হাজার ৭১১ জন মানুষ ই-টিআইএন খুলেছেন। সবমিলিয়ে সেবা নেওয়ার হার বেড়েছে ১৯ গুণ। আর রাজস্ব আয় হয়েছে ২০১০ সালের তুলনায় ৭ গুণের বেশি। অবশ্য সার্বিকভাবে সেবাধর্মী মনোভাব নিয়েই আয়কর মেলার আয়োজন করতে হয়। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মেলা করা হলে সেবা ও সচেতনতা সৃষ্টির ফোকাসটা বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, আয়কর মেলা কোনো বাণিজ্যিক মেলা নয়। সেবা প্রদান, প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলেই দেশে কর জিডিপি অনুপাত বাড়বে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা। নারী ও ৬৫ বছর ঊর্ধ্ব করদাতাদের ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কর দিতে হবে না। প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৪ লাখ টাকায় রাখা হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের জন্য করমুক্ত সীমা আরো ৫০ হাজার বেশি। এছাড়া গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সাধারণ করদাতাদের ক্ষেত্রে আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকার পর প্রথম ৪ লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, এর পরের ৬ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, আর পরবর্তী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়কর প্রদানে বাংলাদেশের বহু মানুষের অনীহা একটি সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। এ অনীহার জন্য দায়ী কিছুটা আয়কর ব্যবস্থাও। সুনাগরিকরাও আয়কর প্রদানের বিদ্যমান পদ্ধতিতে অস্বস্তি বোধ করেন। বর্তমানে আয়কর ব্যবস্থায় গতি আনতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পদ্ধতিগত জটিলতা এখনও পুরোপুরি দূর করা যায়নি। আয়কর মেলার আয়োজন মূলত এজন্যই। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আয়কর মেলা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে- কর প্রদানে মানুষকে সচেতন করা, কর বিভাগকে করদাতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা।
একথা সত্য, আয়কর মেলার মাধ্যমে কর সংস্কৃতির বিকাশ ও কর সচেতনতা বেড়েছে। করদাতারা আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করছেন। ফলে আয়কর মিলনমেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মেলার আকারও বেড়েছে। আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি তথা করদাতাবান্ধব পরিবেশ সৃজনের পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়াসের ফসল হিসেবে এই মেলা গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষত বাঞ্ছিত পরিমাণ আয়কর আহরণ সরকারের রাজস্ব তহবিলের স্ফীতির জন্য শুধু নয়, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্যও জরুরি। করমেলায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে- করদাতারা দেশের উন্নয়নে শরিক হতে আগ্রহী। তবে অনেকেই ঝামেলামুক্ত উপায়ে বা পরিবেশে কর দিতে চান এবং তারা কর দেওয়াকে দায়িত্ব মনে করেন। তাদের এ আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। তাদের উত্সাহী দায়িত্ববোধের প্রতি সম্মান দেখাতে ইচ্ছুক রাজস্ব আহরণে নিয়োজিত কর্মকর্তারা; উপরন্তু জনগণের আগ্রহকে সমীহ করতে শিখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও।
n লেখক :সরকারি কর্মকর্তা
