কৃষি

বীজ সংরক্ষণে কৃষকের অধিকার

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৫৬

শত-শত বছর ধরে কৃষকরা সারা বিশ্বে নতুন-নতুন জাতের শস্য বীজ এবং শস্যের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। বাণিজ্যিক জাতগুলোর প্রেক্ষাপটে কৃষকদের নিজস্ব বীজ উত্পাদন এবং সংরক্ষণের প্রাচীন অধিকার চিহ্নিত করার বিষয়টিকে নীতি নির্ধারকরা প্রায়শই চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু কৃষকরা তাদের অধিকার এবং নিজস্ব জাতগুলোর গুরুত্ব বিষয়ে ক্রমশ সচেতন হচ্ছেন।

কৃষকদের কথা হচ্ছে, ‘আমার অধিকার, আমি বলতে পারি, যেসব স্থানীয় শস্য আমি উত্পাদন করি, সেগুলো আমারই এবং আমার বীজের ওপর আর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমি সেগুলো বিক্রি করবো কি-না, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমারই।’

বর্তমানে গবেষকরা গুণিতকহারে স্থানীয় জাতের কৃষকদের বীজগুলোর ফলন বাড়াচ্ছেন এবং তারপর সেগুলো আবার ফিরে কৃষকদের কাছেই বিক্রি করছেন। কিন্তু যখন কৃষকরা শস্য উত্পাদন করে, তখন তা আর বীজ থাকে না; এবং গবেষকরা বলেন যে, কৃষকদের প্রতি বছর বীজ কেনা প্রয়োজন। কিন্তু আগেকার দিনে, কৃষকদের স্থানীয় বীজগুলোকেই বার বার ব্যবহার করা যেত। অতীতের মতো এখনো কৃষকরা তাদের স্থানীয় জাতগুলো ব্যবহার করতে পারছেন; এগুলো কৃষকদের সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মের সংস্কৃতি-কৃষ্টি, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানেও উপকারে লাগছে।

নিজ-নিজ পরিবার ছাড়াও আরেকটি জিনিসকে কৃষকরা তাদের হূদয়ের খুব কাছে রাখেন, আর তা হচ্ছে — বীজ।  তারা কৃষক হিসেবে গর্বিত। কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে খাবার এবং সহায়তা প্রদান করেন। প্রকৃতপক্ষে, কৃষকরা সারা বিশ্বের খাবার যোগান দিয়ে থাকেন। সুতরাং পাঠকরা নিশ্চয়ই কৃষকদের সাথে একমত হবেন যে, তাদের নিজেদের বীজ নিজেদের কাছে রাখাটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এখন কৃষকদের জানার অধিকার রয়েছে, কত ভালোভাবে তারা তাদের বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন। এখন আমরা কৃষকদের কাছে প্রশ্ন রাখতে পারি যে, কোথা থেকে তারা এই বীজ পান? আগের ফসল থেকে কি তারা কিছু বীজ রেখে দেন? তারা কি কিছু বীজ অন্যান্য কৃষকদের সাথে বিনিময় করেন; অথবা তারা কি মাঝে-মাঝে স্থানীয় বাজার থেকে বীজ কেনেন? আমাদের মাঝে কেউ-কেউ কৃষক প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় কৃষি প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বীজ কিনে থাকেন। যা-ই হোক, তারা যে বীজ বিক্রি করেন, সেসব জাত প্রধানত অন্য কোথাও উত্পাদিত এবং সেগুলো প্রায়ই বেশি দামে প্রত্যেক মৌসুমে কিনতে হয়। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় স্থানীয় জাতের শস্যগুলো ভালো জন্মায় এবং প্রশংসা করার মতো ভালো কিছু জাত আমাদের রয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখার জন্য এসব জাত সংরক্ষণ করা দরকার। আমাদের সরকার খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রে জেনেটিক শস্য সম্পদ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তারা সারা বিশ্বের ১৪০টি দেশের সরকারের সাথে যৌথভাবে এই কাজটি করেছে। এই চুক্তিটি আমাদের কৃষি খামারে সংরক্ষিত বীজগুলো সহভাগিতা ও বিক্রি করা এবং আমাদের সনাতন জ্ঞানকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমাদের অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই চুক্তিটি বীজ ব্যবহার থেকে উদ্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সহভাগিতার উপকারিতার বিষয়ে আমাদের অধিকারের ব্যাপারটিকেও চিহ্নিত করে থাকে।

আমাদের কৃষকরাও তাদের স্থানীয় বীজ বিনিময় ও বিক্রি করতে আসেন। এভাবে ফসল বৈচিত্র্যের সুযোগ সত্যিই অভাবনীয়। কৃষকরা যদি একসাথে থাকে এবং একই সুরে কথা বলে, তাহলে সরকার কথা শুনবে এবং কৃষকদের অধিকার নিয়ে চর্চা করবে।

n লেখক : কোঅর্ডিনেটর, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড সিড প্রোমোশন প্রোগ্রাম, সিসিডিবি, ঢাকা