বৈদেশিক মুদ্রার খুবই কম রিজার্ভ এবং ঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকায় ১৯৯৮’র এশীয় অর্থনৈতিক সমস্যা চলাকালীন সময়ে শ্রীলঙ্কা মালয়েশিয়ার শরণাপন্ন হয়ে অর্থাত্ তাদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বৈতরণী পার করেছিল। তখনকার কথা অনুসরণ করেই দ্বীপরাষ্ট্রটি হালে পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ও আমদানি কমাতে বেশ কিছু নিয়মারোপ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ওপর নির্ভরতা কমানো। অথচ এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ঠিকই পৌঁছেছে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলারে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
শ্রীলঙ্কার আরোপ করা নতুন নিয়মগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে, শিপমেন্টের ১৮০ দিনের মধ্যে রপ্তানি আয়ের প্রত্যাবাসন, কিছু রপ্তানি প্রক্রিয়াকে তাদের নিজস্ব মুদ্রায় (রুপি) রূপান্তর এবং বাণিজ্যিক ঋণগ্রহীতাদেরকে তাদের গৃহীত মোট বৈদেশিক মুদ্রার একটা অংশকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সমর্পণ। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে রাজস্বের পরিমাণ অত্যধিক কমে যাওয়া এবং আইএমএফের ঋণের অনুপস্থিতে রিজার্ভের ‘রক্তক্ষরণ’ এড়ানোই এসবের মূল লক্ষ্য। যার পরিপ্রেক্ষিতে দ্য সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, সাম্প্রতিককালে গৃহীত পদক্ষেপগুলো শ্রীলঙ্কার ঋণচিত্রকে শক্তিশালী, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতার উন্নতিকরণে সহযোগিতা জোগাবে।
গৃহীত নতুন পদক্ষেপগুলো শ্রীলঙ্কাকে আইএমএফের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকেও বাঁচাবে, যারা ঋণই দিয়ে কঠিন সব শর্ত সংযোজন করে। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রপতি মাহাথির মোহাম্মদের দেওয়া স্বপ্রণোদিত ও সহজ শর্তের ঋণ শ্রীলঙ্কাকে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। তখনকার এশীয় অর্থনৈতিক মন্দা শেষপর্যন্ত এশীয় মুদ্রা সমস্যায় রূপ নিয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওয়েলিগামাগে ডন লক্ষণ জানিয়েছেন, এ বছর বহিঃঋণ বাবদ তাদেরকে প্রদান করতে হবে ৩৭০ কোটি ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটি পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানি, রেমিট্যান্সও আর্থিক অন্তঃপ্রবাহ মারফত চলতি বছরে ৩২০০ কোটি ডলার পওয়ার আশা করছে। সে জায়গায় অনুমিত বহিঃপ্রবাহের পরিমাণ ২৭৬০ কোটি মার্কিন ডলার। সে হিসেবে ঋণসেবা পরিশোধে উদ্বৃত্ত থাকবে ৪৪০ কোটি ডলার। অর্থ পুঁজি বাজার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিভার্দ সাবরাল জানিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান তৃষ্ণা হলো বিদেশি ধারের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানো’। সিটি গ্রুপ ইনকরপোরেশানের বিশ্লেষক জোহান চুহা গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তার এক রিপোর্টে তথ্য দিয়েছেন চলতি বছরের জুলাইয়ে বন্ড বাবদ সরকারকে গুনতে হবে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ। এ নিয়ে সরকারের মধ্যে রয়েছে প্রবল মতভেদ।
ব্লুমবার্গ কর্তৃক প্রণীত দাম অনুসারে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ২০৩০ সালে পরিশোধনীয় ডলার বন্ডসমূহের জন্যে প্রতি ডলার বাবদ দিতে হবে ৫৯ সেন্ট। অথচ বৃহত্ রেটিং ফার্মগুলো শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার আগে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত বন্ডসমূহের জন্যে ডলারপ্রতি দিতে হয়েছে ৮৪ সেন্ট, যা কি না শুধু বেশি নয়, খুব বেশি। এ বছরের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসে। অথচ দুই বছর আগেও ছিল ৮৯০ কোটি ডলার, যা তিন বছরেরও কিছু বেশি সময়ের আমদানি খরচ মেটানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল। বৈদেশিক রিজার্ভের অবস্থা বেগতিক দেখে তুলনামূলকভাবে ছোট্ট এ দেশটি ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে অনুদান ও ঋণের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা।
