আবাসিক এলাকায় ‘বাস টার্মিনাল’, হর্নের উচ্চ শব্দে স্বাস্থ্যের ক্ষতি

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২১, ০৭:২২

আমাদের দেহের সংবেদনশীল অঙ্গ কান। উচ্চ শব্দ আমাদের কানের পর্দাকে অনেক জোরে ধাক্কা দেয়। এই উচ্চ শব্দের কারণে আমাদের কানের পর্দা নষ্টও হয়ে যেতে পারে। আর কানের পর্দা নষ্ট হওয়া মানে হচ্ছে চিরকালের জন্য কানে না শোনা। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সবসময় বাস-মিনিবাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ সব যানবাহনের হর্ন বাজানো হয়। মনে হয় যেন রাস্তায় যানবাহনগুলো হর্ন বাজানোর মহোত্সবে মেঠে ওঠে।

হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অফিস-আদালত বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের চারদিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষেধ সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকলেও কেউ তা মানছে না। এমনকি অনেক হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে রয়েছে আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড। নগরীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও আবাসিক এলাকায় আইন না মেনে গড়ে উঠেছে বাস টার্মিনাল। সারা দিন চলার পর রাতে নগর পরিবহনের বাস চলে যাওয়ার নিয়ম গ্যারেজে। আর দূরপাল্লার বাসের চলাচল, যাত্রাবিরতি ও যাত্রী ওঠানামা সবই হওয়ার কথা নির্ধারিত টার্মিনালে। কিন্তু পরিবহন মালিকেরা এ আইন মানছেন না।

বিআরটিএ ও পুলিশ সূত্র জানায়, সড়কে বাস রাখা হবে না এই অঙ্গীকার বাসমালিকদের কাছ থেকে কাগজে-কলমে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে তারা সেটা মানছেন কি না, তা কেউ খতিয়ে দেখে না। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পরিবহন মালিকেরা নিয়মটা মানছেন না। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণে চিকিত্সাধীন হূদরোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে শতশত মানুষ। অতিরিক্ত শব্দের কারণে রাজধানীর একটি বড় অংশের মানুষেরই কানে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে। সরকার এখনই উদ্যোগী না হলে বা মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি না হলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো খারাপের দিকে যাবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নগরীর ব্যস্ত এলাকাগুলোর একটি শাহবাগ। চারদিকের যেদিকে দৃষ্টি যায় সেদিকই গাড়ির দীর্ঘ সারি। একটি আরেকটিকে অতিক্রমের চেষ্টায় ক্রমাগত হর্ন বাজিয়েই চলেছে। অথচ মোড়ের দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুটি বড় হাসপাতাল। একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, অপরটি বারডেম হাসপাতাল। বারডেমের সামনে ট্রাফিক পুলিশের দক্ষিণ পাশে হর্ন বাজানো নিষেধের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টিপাত করার সময় নেই কারোরই।

একইচিত্র সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও পান্থপথ এলাকায়। সেখানে রয়েছে ল্যাবএইড কার্ডিওলজি স্পেশালাইজড হাসপাতাল, পপুলার হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সাধীন একাধিক রোগীর অভিযোগ, দিনের বেলা তো বটেই রাতেও শব্দের কারণে ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়।

নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না কেউ

দূরপাল্লার বাসগুলো সন্ধ্যার পরই নির্ধারিত টার্মিনাল ছেড়ে রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। এমন ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেখা গেছে, সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা হয়। এর মধ্যে রাসেল স্কয়ার, কলেজগেট, মালিবাগ রেলগেট এলাকা ও রাজারবাগে এ দৃশ্য নিত্যনৈমিত্তিক। নগরীতে ছোট-বড় ছয়টি ডিপো থাকার পরও সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাসও সড়কে রাখা হয়।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, নিয়ম থাকলেও কোনো পরিবহন মালিক নিয়ম মানেন না। পুলিশের এ কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজধানীর পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পিত নয়। তবে তারা দাবি করেন, এ অবস্থার মধ্যেও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ মামলা দিয়ে ও বুঝিয়েশুনিয়ে মালিকদের আইন মানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টাই বাস চলাচল করে। আসলে গ্যারেজে রাখার সময়ও পাওয়া যায় না। দূরপাল্লার বাস শহরে আনা হয় যাত্রীদের সুবিধার জন্যই।

বিধিনিষেধ ও ক্ষতিসমূহ

নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ আর পরিবেশবিদরা বলছেন, আকস্মিক বিকট বা উচ্চশব্দ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহে রক্তচাপ, হূদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, শ্রবণশক্তি হ্রাস মাংসপেশি সংকোচন এবং পরিপাকে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে আকস্মিক উচ্চ শব্দ হূদরোগীদের জন্য মারাত্মক। উচ্চ শক্তির কারণে বৃদ্ধ, শিশু ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়।

সচেতনতার অভাব

পরিবেশ দিবস এলে মাঝেমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর হর্ন না বাজানোর অনুরোধ করে পোস্টার-লিফলেট বিতরণ করলেও দিবসটি শেষ হয়ে গেলে সচেতনতা বাড়াতে তেমন কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ে না। অথচ অধিদপ্তরের প্রচারপত্রই বলছে হর্নের অতি ব্যবহারে শুধু শ্রবণশক্তিই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাধরা, গ্যাস্ট্রিক আলসার, ফুসফুসের প্রদাহসহ নানা রকমের মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, যানবাহনের শব্দ দূষণ স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায়। এমনকি মানুষের মৃত্যুও হতে পারে।

হর্ন যদি এত ক্ষতি করে তাহলে এর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্পরতা নেই কেন—জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের সঙ্গে বৈঠকে অনেক সিদ্ধান্তই হয়। কিন্তু নানা কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে তিনি বলেন, নগরীকে যানবাহন বেশি আর এ কারণে যানজট বাঁধে। তাই মানুষ অধৈর্য্য হয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টায় হর্ন বাজায়। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব আছে।

হর্ন বাজানোর তালিকায় বেশি মোটরসাইকেল

হর্ন বাজানোর প্রবণতা মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে বেশি। রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে নগরীতে এখন বেড়েছে মোটর সাইকেলের সংখ্যা। পরের তালিকায় রয়েছে প্রাইভেট চালকরা। অনেকে আবার হর্নের পাশাপাশি উচ্চ শব্দ করে এমন যন্ত্রও লাগায় তাদের যানবাহনে। ফলে গাড়িগুলো কোনো এলাকা দিয়ে গেলে বহু দূর থেকেও এর শব্দ পাওয়া যায়। গাড়ি চালকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যানজটে আটকে থেকে সামনের গাড়ি চালানোর তাগিদ দিতেই হর্ন বাজান। চালকদের একটি বড় অংশ সামনের গাড়িকে সংকেত দিতে বিশেষ ধরনের বাতি থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার করেন না।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০০৭ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুর রোড, গুলশান, ধানমন্ডিসহ বেশ কিছু সড়কে হর্ন বাজানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছিল। এই আদেশ হওয়ার পর কয়েক দিন অভিযানে জরিমানা করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হতো। কিন্তু এখন বন্ধ হয়ে গেছে সব অভিযান। আসলে এখনকার পুলিশ কর্মকর্তারা সেই আদেশের কথা মনেই করতে পারছেন না।

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় কথা হয় একাধিক মুদি দোকানির সঙ্গে। তারা ঐ এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট দোকান চালান। তাদের মধ্যে দোকানি বেলাল হোসেন বলেন, ‘শব্দ দূষণের মধ্যে থাকায় এখন কানে খুব কম শুনি। ডাক্তার বলেছে বেশি শব্দের ভেতরে থাকায় এই অবস্থা। সাধারণ কথা শুনতে কষ্ট হলেও এই সড়কের তীব্র শব্দে মাথা ব্যথা শুরু হয়। অকারণে হর্নের ব্যবহারই এর জন্য দায়ী। অথচ বিষয়টি নিয়ে এখনো নীরব ভূমিকায় রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) জয়দেব চৌধুরী বলেন, যেসব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ সেসব এলাকায় হর্ন বাজানোর বিষয়ে প্রতিনিয়তই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ট্রাফিক অভিযানেও এ সংক্রান্ত প্রায় প্রতিদিনই মামলা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাফিক পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, পুরোপুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে সর্বোপরি এ জন্য সচেতনার প্রয়োজন রয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

হর্ন বাজানো নিয়ে ডিএমপির ৯ নির্দেশনা

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া হর্ন বাজানোর বদভ্যাস ত্যাগ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। হাসপাতাল এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। মসজিদ মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। যেকোনো সংরক্ষিত এলাকায় (বিশেষ করে সচিবালয়) হর্ন বাজানো যাবে না। আদালত এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। রাতে হর্ন বাজানো যাবে না। যেখানে হর্ন বাজানো নিষেধ আছে সেখানে হর্ন বাজানো যাবে না।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি