শফিকুর রহমান রয়েল
চীনা যুবক মেই এইকাই মাধ্যমিক শেষ করেই চলে গিয়েছিলেন ইউক্রেনে। অথচ এর আগে দেশটি সম্পর্কে তার কোনও ধারণা ছিল না। ভাবতেন, অবস্থান হয়ত আফ্রিকা মহাদেশে আর ভাষা সম্ভবত ফ্রেঞ্চ কিংবা স্প্যানিশ। ওই দেশে ১২ বছর পড়াশোনার পর গত বছরের শেষদিকে চীনে ফেরত আসেন মেই এইকাই। অবশ্য একা আসেননি, সঙ্গে ছিল তার ইউক্রেনীয় স্ত্রী ও সন্তান। খবরটি ছবিসহ ফলাও করে ছেপেছিল চীনের একটি পত্রিকা। এর কয়েকদিন পরেই আরেকটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল কার্টুন, যার নীচে লেখা ছিল— কোনও সমস্যা নেই, চীনের কনে সংকটের সমাধান করবে ইউক্রেন। রাষ্ট্র পরিচালিত বেইজিং নিউজ সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, চীনে বিয়ের বাজারে ভয়াবহ পাত্রী সংকট চলছে। দিন দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সমাধান হতে পারে ইউক্রেনের নারীরা, কারণ সেখানে পুরুষদের চেয়ে নারীরা সংখ্যায় অনেক বেশি। তাই বিয়ের জন্য পাত্রী ‘আমদানি’ একটা সমাধান হতে পারে। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ পার্ক কিংবা অন্যান্য বিনোদন কেন্দে একা একাই ঘুরছেন, চীনে এমন পুরুষের দেখা মেলে অহরহ।
চীনে মেয়েদের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় উদ্বেগের সীমা নেই। প্রতি ১০০ মেয়ের বিপরীতে ছেলেদের বৈশ্বিক গড় যেখানে ১০৫, সে জায়গায় চীনে ১০০ মেয়েশিশুর বিপরীতে জন্ম নিচ্ছে ১১৫টি ছেলেশিশু। চীনের কঠোর পরিবার পরিকল্পনা নীতির সঙ্গে সনোগ্রাম প্রযুক্তি যুক্ত হয়েই এ সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ শহুরে পরিবারের একটির বেশি সন্তান গ্রহণের অনুমোদন নেই। জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে দমিয়ে রাখতেই এমন ব্যবস্থা। ঐতিহ্যগতভাবে চীনে ছেলেশিশুদের কদর বেশি। যে কারণে লিঙ্গ নির্বাচিত গর্ভপাত প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিয়ে আনা যাচ্ছে না। পৃথিবীর সর্বোচ্চ লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করছে বিশ্বের সবচে’ জনবহুল এই দেশটিতে।
বিয়ের জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কপালে স্ত্রী জুটছে না, চীনে এমন লোকের সংখ্যা অগণিত। এসব দেখে বেইজিংয়ের এক পরিসংখ্যানবিদ ব্যাঙ্গ করে ফেসবুকে লিখেছেন — আর বিলম্ব নয়, কালই আমি আমার ছেলেকে বলব তার প্রাথমিক স্কুল থেকে একজন গার্লফ্রেন্ড খুঁজে নিতে! ভবিষ্যতে সে বিপদে পড়ুক, এটি মোটেই কাম্য নয় আমার।
এমনিতেই চীনে নারীরা সংখ্যালঘু, তার ওপর চীনা পাত্রীরা ‘পাচার’ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা চীনা নারীদেরকে বিয়ে করার ব্যাপারে ব্যাপক উত্সাহ দেখায়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক থিরেস হেসকেথ সম্প্রতি চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কে কে কন্যাভ্রূণ হত্যার বিষয়টিকে সমর্থন করে? বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই এতে হাত তুলেছিল। হেসকেথের বিশ্বাস, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কারণেই এমনটি ঘটছে।
