বিজেপির চিন্তার কারণ হবেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৭

তালেব রানা

 

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আর মাস তিনেক বাকি। যখন সব দল এই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কংগ্রেসের তরফ থেকে মাঠে নামানো হচ্ছে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি প্রিয়াঙ্কাকে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম থেকেই দায়িত্ব নেবেন তিনি। তার ভাই ও বর্তমানে কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীর দাবি, একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই প্রিয়াঙ্কাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামীতে উত্তর প্রদেশে সরকার গড়বে কংগ্রেস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রিয়াঙ্কা কংগ্রেসের ‘ট্রাম্প কার্ড’। গত প্রায় দুই দশক ধরে দলের নেতা-কর্মীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন ক্যারিশম্যাটিক প্রিয়াঙ্কাকে কংগ্রেসের হাল ধরতে। অনেকেই ৪৭ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতো সহজাত ক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব গুণ ও দারুণ জনপ্রিয়তা থাকলেও এতদিন ভাই রাহুল গান্ধী ও মা সোনিয়া গান্ধীর আড়ালেই ছিলেন তিনি। কিন্তু দলের প্রয়োজনে লোকসভা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিচ্ছেন তিনি। যদিও ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দাবি রাহুল গান্ধী ব্যর্থ হয়েছেন, সেজন্য শেষ ভরসা হিসেবে প্রিয়াঙ্কাকে আনা হয়েছে। পরিবারের বাইরে কাউকে খুঁজে পায়নি কংগ্রেস।

আসলে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাজনীতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন মা সোনিয়া গান্ধী ও ভাই রাহুল গান্ধীর হয়ে যথাক্রমে রায়বরেলি ও আমেঠি আসনে প্রচারের কাজেই। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কি আদৌ পারবেন কংগ্রেসের পুরনো সুদিন ফেরাতে? দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সোমা চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, রাজনৈতিক উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব বা প্রতিপক্ষের টক্কর নেওয়ার ক্ষমতা ধরলে প্রিয়াঙ্কা অবশ্যই কংগ্রেসের জন্য সম্পদ। কিন্তু ভোটের মাত্র কয়েকদিন আগে যেভাবে তিনি উত্তরপ্রদেশের মতো কঠিন রাজ্যে সরাসরি মোদী-আদিত্যনাথের সঙ্গে পাল্লা দিতে নামলেন, তার ফলাফল কী হয় আমি সে দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকব। কোনো সন্দেহ নেই রাজনৈতিকভাবে তিনি একটা বিরাট ঝুঁকি নিয়েছেন!

তবে অনেকেই মনে করেন, কংগ্রেসের সব স্তরের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে আম জনতার মধ্যে প্রিয়াঙ্কার গ্রহণযোগ্যতা দাদি ইন্দিরা গান্ধীর মতোই। পরীক্ষিত না হলেও তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ওপর অনেকেই আস্থা রাখেন। এসব কারণেই তাকে কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবেও অনেকে উল্লেখ করেন।

এনডিটিভি’র অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে দিল্লিভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক আশুতোষ লিখেছেন, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী যেমন বিজেপির হাল ধরে চমক দেখিয়েছিলেন, ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে প্রিয়াঙ্কার অভিষেকও তেমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। এর আগে রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অতিথি’র মতো। কিন্তু এখন তিনি কংগ্রেসের বড় দায়িত্ব নিয়ে আসছেন। ভাই রাহুল গান্ধী ও বাবা রাজীব গান্ধীরও দলে অভিষেক হয়েছিল সাধারণ সম্পাদকের পদে। তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে, প্রিয়াঙ্কা নিজেকে কোনো গন্ডির মধ্যে আটকে রাখবেন। আগামী নির্বাচনের প্রচারণায় তিনি বড় প্রভাব ফেলতে চলেছেন।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের চেয়ে কংগ্রেসের অবস্থা এবার তুলনামূলক অনেক ভালো। কংগ্রেস যখন বিপর্যয় পেছনে ফেলে ভালো করতে শুরু করেছে তখনই যুক্ত হলেন প্রিয়াঙ্কা। সর্বশেষ মধ্য প্রদেশ, চত্তিশগড় ও রাজস্থানের বিধানসভায় জিতেছে দলটি। রাহুল গান্ধীও প্রমাণ করেছেন যে তিনি আর মোদীর ভাষায় ‘পাপ্পু’ নেই।

আশুতোষের মতে, চার কারণে প্রিয়াঙ্কা কংগ্রেসের সম্পদ হতে পারেন। প্রথমত, প্রিয়াঙ্কার রয়েছে ‘সলিড ক্যারিশমা’। কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আকৃষ্ট করে চলেছেন। রাহুলে যারা আকৃষ্ট হননি তারা প্রিয়াঙ্কার উপস্থিতিতে কংগ্রেসে ভোট দেবেন ধরে নেওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, প্রিয়াঙ্কা রাহুলের বিশ্বস্ত সহযোগী এবং বড় পরামর্শক, তিনি রাহুলকে যেভাবে পরামর্শ দিতে পারবেন সেটা হয়ত অনেকে বলতে সাহস করেন না। তৃতীয়ত, সোনিয়া গান্ধীর শারীরিক অবস্থা বেশি ভালো নয়, অতীতের মতো তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যেতে পারবেন না। কিন্তু এখন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা আলাদাভাবে প্রচারণায় উপস্থিত হতে পারবেন। এতে বাড়তি সুবিধা পাবে কংগ্রেস।

চতুর্থত, উত্তর প্রদেশে প্রিয়াঙ্কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে ২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে ‘আপার কাস্ট’। যদিও এখন তারা বিজেপির প্রতি ক্ষুব্ধ। এই শ্রেণি অতীতে কংগ্রেসের বড় সমর্থক ছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন প্রিয়াঙ্কা। এসব দিক বিবেচনায় রাজনীতিতে প্রিয়াঙ্কার প্রবেশ কংগ্রেসের জন্য যেমন খুশির খবর, তেমনই বিজেপির জন্য দুশ্চিন্তারও।