বরকতুল্লাহ সুজন
ফেব্রুয়ারির কোন এক দিনে দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। এরই মধ্যে উন তাঁর সভাসদদের ভালোভাবে এই শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, বৈঠকের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন দেশটির নেতা। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ওয়াশিংটনে দেখা করেন পিয়ংইয়ংয়ের প্রতিনিধি কিম ইয়ং চোল। বৈঠক শেষে দুই পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছিল, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ দুই নেতার বৈঠক হতে পারে। তবে সিঙ্গাপুরের সেই প্রথম বৈঠকের পর দ্বিতীয় বৈঠকটি ঠিক কবে ও কোথায় হবে তা জানানো হয়নি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে। একারণে বৈঠকের সম্ভাব্য ভেন্যু ও তারিখ জানতে একরকম অভিযানে নামে বিশ্বের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলো। তারা হাড়ির খবর বের করে আনতে সক্ষমও হয়েছে!
পশ্চিমা অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বলছেন, ট্রাম্প-কিম সম্মেলনের পরবর্তী ভেন্যু হবে ভিয়েতনাম। যদিও এই খবর প্রকাশের পর দেশটি বলেছে, কোন পক্ষ থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় তারা। এরপর আবার জানানো হয়, ট্রাম্প-কিম সম্মেলন আয়োজনে পুরোপুরি প্রস্তুত ভিয়েতনাম। ধারণা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় বৈঠকে কিম আরো পরিষ্কার পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। যার মধ্যে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম, এমন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বয়কট করা। বিনিময়ে পিয়ংইয়ং চায় জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চিঠি চালাচালি হচ্ছে বলে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ।
২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষার কারণে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় দুই দেশ। ব্যক্তিগত রেষারেষি ও বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প ও উন। একে অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন এবং মানচিত্র থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ারও হুমকি দেন। কিন্তু পরিশেষে গত বছরের জুন মাসে সিঙ্গাপুরে প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরিয়ার নেতা। যা শেষ হয় নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে কিম জং উনের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে। আগে সবসময়ই এই প্রতিশ্রুতি উত্তর কোরিয়া দিয়ে এসেছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে। ফলে পিয়ংইয়ংকে নিরস্ত্রীকরণ করার ওয়াশিংটনের আকাঙ্ক্ষাটি অস্পষ্টই থেকে যায়। তবে প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে সম্পর্ক শুরু হয়, তা একেবারেই নতুন এবং কোরীয় উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তির জন্য শুভকর। তাই সবার দৃষ্টি দ্বিতীয় সম্মেলনের দিকে।
ট্রাম্প-কিম প্রথম বৈঠকটি ছিল দীর্ঘ আলোচনার। চীনা বিশ্লেষকরা একে বলছেন, ‘লিবিয়ান মডেল’। যেখানে লিবিয়ার তত্কালীন নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ করেন এবং পরবর্তীতে সেদেশের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আরও পরে গাদ্দাফির মর্মান্তির মৃত্যু দেখে বিশ্ববাসী। লিবিয়া মডেলটি তাই নিশ্চয়ই উত্তর কোরিয়ার কাছে পছন্দের হওয়ার নয়। চীনা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কারণেই পিয়ংইয়ং প্রাধান্য দেবে ভিয়েতনামকে। যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং এখন পর্যন্ত সেদেশের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়তে মরিয়া ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন পর্যন্ত ভিয়েতনাম নিজেদের পায়ে ভর করে উন্নত হওয়া চেষ্টা করছে এবং একমাত্র সেদেশ থেকেই শিক্ষা নিতে পারে উত্তর কোরিয়া।
উন চান নিজ দেশের মরণাপন্ন অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভাল সম্পর্ক রক্ষা করতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবেই উত্তর কোরিয়ায় নিজ পরিবারের শাসন টিকিয়ে রাখতে চান তিনি। এছাড়া বেশ কয়েকটি মৌলিক ইস্যুতে এখনও নাজুক অবস্থায় রয়েছেন ট্রাম্প ও কিম। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্থবির হওয়া পরমাণু আলোচনা নতুন করে শুরু করতে নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমকে যা যা পদক্ষেপ নিতে হবে। আর অন্যটি হলো ওই সব পদক্ষেপের বিনিময়ে পিয়ংইয়ং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী কী পাচ্ছে। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে তাই অনেক বেশি বাস্তববাদী হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। কারণ এযাবত্কাল পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হুমকি দিয়েও কোন কাজ হয়নি। সেখানে একতরফাভাবে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুললে তাতে খুব বেশি কাজ হবে বলে মনে হয় না।
