আশেক খান আলেখীন
মোবাইলে নিজের এবং সেইসঙ্গে প্রিয়জনদের নিয়ে সেলফি তুলতে অনেকেই পছন্দ করেন। এটা দোষের কিছু নয়, অস্বাভাবিকও নয়। তবে এটা খ্যাপামির পর্যায়ে চলে গেলেই সমস্যা। অনেকে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তুলে থাকেন যাকে সুইসাইডের অনুকরণে ‘সেলফিসাইড’ বলে অভিহিত করেন অনেকে। যবে থেকে মোবাইলে সেলফি তোলার প্রবণতা শুরু হয়েছে তখন থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তোলার মত এই আহম্মকি কাজটা করে আসছে লোকজন। মারাও যাচ্ছে অনেকে। তবুও হুঁশ নেই কারো। এই মারাত্মক ‘সেলফিসাইডের’ প্রবণতা তরুণ-তরুণীদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে সর্বমোট ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে ভারত থেকে গতবছর প্রকাশিত জার্নাল অব প্রাইমারি মেডিসিন অ্যান্ড ফ্যামিলি কেয়ারে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতেই এই ধরনের বিপজ্জনক সেলফি তোলার প্রবণতা বেশি এবং সেখানেই এভাবে বেশি লোক মারা যাচ্ছে।
নিউইয়র্কের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জিলডা কার্ল সেলফিকে এক নতুন ধরনের মাদকাসক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বলেছেন- লোকজন মনে করে এটা করা খুব সহজ, কারণ এতে কোনো খরচ নেই। কিন্তু তোমাকে তোমার জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হতে পারে।
কার্ল বলেন, অনেকে কখনও কখনও নিজেকে খুব বীর বলে মনে করে, ভাবে তার দ্বারা সব অসম্ভব কাজও করে ফেলা সম্ভব। এমন প্রবণতাই তাদেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তোলার দিকে অর্থাত্ ‘সেলফিসাইডের’ দিকে ঠেলে দেয়। তারা এসমস্ত সেলফি সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে ছড়িয়ে দেয় এবং বেশি বেশি লাইক আসলে তারা খুব আত্মপ্রসাদ লাভ করে। এই পুরো ব্যাপারটাই ড্রাগ এডিকশনের মত। একবার এতে আসক্ত হলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া খুব কঠিন। আর এক্ষেত্রে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করারও কোনো সুযোগ নেই। কারণ মরার পর তো আর ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না।
দেখা গেছে, ‘দুঃসাহসিক’ সেলফি তুলতে গিয়ে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বহু উঁচু থেকে পতনের ফলে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আশেপাশে পর্বত শিখর, উঁচু ভবনের ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে ‘নো সেলফি জোন’ ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিপজ্জনক সেলফি তোলার ক্ষেত্রে ভারতের পরই রাশিয়ার স্থান। সেখানে এ ধরনের সেলফি তোলার ক্ষেত্রে লোকজনের মধ্যে বড় ধরনের পাগলামি কাজ করে। রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ইয়েলেনা আলেক্সেইভা গতবছর গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, বিপজ্জনক সেলফি তুলতে গিয়ে রাশিয়ায় হতাহতের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০১৮ সালে রাশিয়ায় বেশ কয়েকজন মারা গেছেন, কয়েকশ’ লোক গুরুতর জখম হয়েছেন। এক মহিলা নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সেলফি তুলতে গেলে অসাবধানতাবশত ট্রিগারে চাপ পড়ে যায় এবং গুলিতে তিনি মারাত্মক জখম হন। দুই ব্যক্তি হ্যান্ড গ্রেনেডের পিন খোলার সেলফি তুলতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যান। এক তরুণ রেললাইনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।
এসব বিপজ্জনক সেলফি তোলা থেকে লোকজনকে বিরত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানাভাবে প্রচারণা চালানো সত্ত্বেও কমছে না ‘সেলফিসাইডের’ প্রবণতা। এসব দেখে এখন বলতে ইচ্ছা করে- কোন্ কুক্ষণে যে সেলফি এসেছিল! ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’
