অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার পরিণতি ভালো নহে

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৮

কথায় আছে—টাকা মাটি, মাটি টাকা। মাটির ওপর ভিটাবাড়ি গড়িয়া ওঠে, ফসল ফলে, মাটি দিয়া তৈরি ইটে সচল থাকে অবকাঠামো উন্নয়নের চাকা। সকল কিছুর নেপথ্যে মাটি আর মাটি। এই মাটি আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু বেশ কিছুকাল ধরিয়া ফসলি মাটি ও নদী তথা বিভিন্ন জলাশয়ের মাটি চলিয়া যাইতেছে ইটভাটায়!

সংবাদপত্রের আর্কাইভ অনুসন্ধানে এইরকম অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ পাওয়া যায়।  যেমন— রামগঞ্জে ফসলি জমির মাটি লোপাট। নরসিংদীর কাজৈর গ্রামের কয়েকটি ফসলি জমিতে তিন-চারটি ভেকু (মাটি খননযন্ত্র) দিয়া মাটি কাটা হইতেছে। গাজীপুর কালিয়াকৈরের একটি সংবাদে জানা যায়, বড়ইবাড়ির ব্রিজ-সংলগ্ন ও কালিয়াদহ এলাকার তুরাগের পাড় হইতে মাটি খননযন্ত্র দিয়া মাটি কাটা হইতেছে। নদীপাড় হইতে মাটি কাটিয়া লইবার কারণে ব্যাহত হইতেছে সরিষা, মুলা, লাউ, কলাইসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফসল উত্পাদন। ঝুঁকিতে পড়িয়াছে নদীপাড়ের রাস্তা ও তাহাদের বসতবাড়ি। পাবনার আটঘরিয়ায় নদীর পাড় কাটিয়া মাটি বিক্রয় করা হইতেছে। অত্রাঞ্চলের এক প্রভাবশালীর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ দল ভেকু দিয়া সুতার বিলের দুই পাড়ের মাটি রাতের আঁঁধারে কাটিয়া সাবাড় করিতেছে। যিনি ভেকু দিয়া মাটি কাটিতেছেন তিনি অবশ্য দাবি করিতেছেন যে, জমির মালিকদের নিকট হইতে ন্যায্য মূল্য দিয়াই তিনি মাটি ক্রয় করিয়া কাটিতেছেন। সুতরাং ইহাতে কাহারো ক্ষতি হইবার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু বাস্তবতা হইল—ওই বিলের পাড় যদি না থাকে তাহা হইলে অত্রাঞ্চলের ফসলি জমির ভিতরে কচুরিপানাসহ বিভিন্ন আবর্জনা ঢুকিয়া পড়িবে। অন্যদিকে বন্যা আসিবার সঙ্গে সঙ্গে জমি ও জমির ফসল পানির নিচে তলাইয়া যাইবে। যাহারা মাটি কাটেন, তাহারা এই অজুহাত প্রায়শই দিয়া থাকেন যে, তাহারা কৃষকদের নিকট মাটি ক্রয় করিয়াই এই কাজ করিতেছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনও এই কারণে নীরব থাকে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৃষকদের অভিযোগ হইল, মাটি কাটা হয় জোর করিয়াই। আর জমিগুলি গভীরভাবে খনন করিবার ফলে পাশের জমিগুলিও ভাঙিয়া পড়িতেছে। যাহার কারণে অনেকে একরকম বাধ্য হইয়া ভাটার মালিকদের নিকট মাটি বিক্রয় করিতেছেন। গত শনিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিতে সরকারি বনাঞ্চলের টিলার লাল মাটি যাইতেছে ইটভাটায় এবং নদীর চরের বালি মাটি যাইতেছে পুকুর ভরাট ও বাসাবাড়ি তৈরির জন্য।

একটি অন্যায়কে যখন প্রশ্রয় দেওয়া হয় কিংবা অন্যায়টিকে যখন আড়াল করা হয়, তখন সেই অন্যায়ের উদাহরণ ছড়াইয়া পড়ে অন্য অঞ্চলেও। যেই কারণে আমরা দেখিতে পাইতেছি যে, সারা দেশেই প্রভাব-প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা এই ধরনের অন্যায় কাজ করিয়া চলিতেছেন অনেক দিন ধরিয়া। প্রশাসন মাঝেমধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে বটে, তবে তাহা যদি অন্য মাটিখেকোদের নিরস্ত করিতে না পারে, তবে তাহা হইয়া উঠে লোক-দেখানো। প্রশাসনের ললাটে কেন এই ধরনের ব্যর্থতার তিলক পড়িবে নিরন্তর?