ইটভাটায় সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাত্রে সেখানেই ঝুপড়ির মধ্যে ঘুমাইয়া ছিলেন তাহারা। সেই অবস্থায় কয়লাবোঝাই ট্রাক উল্টাইয়া পড়িয়াছে তাহাদের উপর। ঘটনাস্থলেই মারা গিয়াছেন ১৩ জন। ভাগ্যক্রমে রক্ষা পাইয়াছেন একাধিক শ্রমিক। কেবল জীবিকার তাগিদে উত্তরাঞ্চলের সুদূর নীলফামারী হইতে কুমিল্লার নির্বান্ধব ইটভাটায় কাজ করিতে আসিয়াছিল দরিদ্র এই মানুষগুলি। বাড়িতে প্রিয় স্বজনেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিলেন তাহাদের জন্য। কাহারও স্ত্রী-সন্তান, কাহারও-বা মা-বাবা। সেদিনই সপ্তাহান্তের মজুরি লইয়া তাহাদের বাড়ি ফিরিবার কথা ছিল। কিন্তু মজুরিপ্রাপ্তি একদিন বিলম্বিত হওয়ায় সেই রাত্রিটি তাহাদের কর্মস্থলেই থাকিয়া যাইতে হইয়াছিল। বাড়িতে তাহারা ঠিকই ফিরিয়াছেন, তবে লাশ হইয়া। কী হইবে এই সর্বস্বান্ত পরিবারগুলির সেই কথা ভাবিবার অবকাশ কোথায় আমাদের? পরিসংখ্যান বলিতেছে, প্রতিদিনই মৃত্যুর এই মিছিলে যোগ হইতেছে গড়ে ২০ জন করিয়া মানুষ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত এক বত্সরে সড়কে ঝরিয়া পড়িয়াছে ৭২২১টি তাজা প্রাণ। আহতের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। ঘরে-বাহিরে-ফুটপাতে কোথাও যে মানুষের জীবন নিরাপদ নহে—ইটভাটার হতভাগ্য শ্রমিকেরা জীবন দিয়া তাহা আবারও আমাদের স্মরণ করাইয়া দিয়া গেল মাত্র। অথচ বিমানবন্দর সড়কে ফুটপাতে দাঁড়ানো অবস্থায় কলেজের শিক্ষার্থীদের হতাহত হইবার ঘটনায় গোটা দেশ যে প্রকম্পিত হইয়াছিল—তাহা তো খুব বেশিদিন আগের কথা নহে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া জোরালো একটি জাতীয় ঐকমত্যও তৈরি হইয়াছিল। মালিক-চালক ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই শক্ত হাতে সড়ক-মহাসড়কে চলমান বিশৃঙ্খলার লাগাম টানিয়া ধরিবার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করিয়াছিলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়াছিল দেশের আপামর মানুষ। কিন্তু সেই স্বস্তির লেশমাত্রও এখন অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
ঘর হইতে বাহির হইয়া আবার নিরাপদে ঘরে ফিরিতে পারিবে কিনা—জনমনে সেই শঙ্কা দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। মালিক-চালকরা বহু প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। প্রশাসনের পক্ষ হইতেও উপর্যুপরি ট্রাফিক পক্ষ পালন হইতে শুরু করিয়া উদ্যোগ-আয়োজনের অভাব নাই। কিন্তু সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা প্রায় অপরিবর্তিতই রহিয়া গিয়াছে। কেহই কোনো প্রকার নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করিতেছেন না। এমনকি পরোয়া করিতেছেন না নিজের জীবনেরও। সড়কের মাঝখানে গাড়ি থামাইয়া যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা চলিতেছে। চলিতেছে বাসগুলির মধ্যে তীব্র রেষারেষি। চালকের আসনে ঠিকই বসিয়া আছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অদক্ষ বেপরোয়া সব কিশোর-তরুণ। অধিকাংশ গাড়ির অবস্থা লক্কড়ঝক্কড় বলিলে কমই বলা হয়। পথচারীরাও যাহার যেখানে ইচ্ছা ব্যস্ত সড়কের উপর দিয়া বিপজ্জনকভাবে রাস্তা পারাপার করিতেছেন। অন্যদিকে, ফুটপাতে হাঁটিবার উপায় নাই। বেশিরভাগই বেদখল হইয়া আছে। ফুটওভারব্রিজের অবস্থাও তথৈবচ। রাস্তারও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়িয়া চলিতেছে অবৈধ পার্কিং। অপরদিকে সড়ক-মহাসড়কগুলির বিদ্যমান গুরুতর কারিগরি ত্রুটি সংশোধন করিয়া স্বয়ংক্রিয় আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনা চালুর দাবি দীর্ঘদিনের হইলেও সেইরকম অর্থবহ কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নহে। বস্তুত বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের কয়েকটি দেশ ছাড়া এমন চিত্র পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে কিনা বলা মুশকিল। সর্বব্যাপী এই উদাসীনতা, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা লইয়া আমরা আর কত লিখিব! আর লিখিলেই-বা কী! কে তাহার তোয়াক্কা করে! তবু স্বজনহারা মানুষের কান্না যতদিন না থামিবে, ততদিন আমাদের এই অরণ্যে রোদন করিয়া যাইতেই হইবে বৈকি।
