মো. শাফায়েত হোসেন
সাড়ে সাত কোটি মানুষের আরেকটি নাম ছিলো বাংলাদেশ। সেই দেশকে অবজ্ঞা করে হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন- বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হতে চলেছে। কিন্তু তার বক্তব্যের সঠিক জবাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কাজের মাধ্যমে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্তির পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত আশা ছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তী চরম সংকটজনক অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে ওঠার এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয় ঝেড়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় পা রাখবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যদিয়ে সে আশা পূরণে ব্যর্থ হলাম আমরা। তবুও এ জাতি মাথা নোয়াবার নয়। তলাবিহীন ঝুড়ি কিভাবে পূর্ণ করতে হয় তারা ভালোভাবেই জানে। সেটা প্রমাণ দিয়েছে এ জাতি বারবার। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোনো দিক থেকে বাংলাদেশ তলাবিহীন নয়। আর বর্তমানে প্রমাণ করে যাচ্ছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। আর তার সঙ্গে আছে প্রায় ১৬ কোটি জনগোষ্ঠী। হেনরি কিসিঞ্জারের মন্তব্যটি যে ভুল প্রমাণিত হবে সেদিন আর বেশি দূরে নয়। তার বড় প্রমাণ হচ্ছে ১৬ মার্চ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক কাউন্সিল জানিয়েছিলো যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে উত্তরণের তিনটি পর্যায়ই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ- যেখানে রয়েছে এক বঙ্গবন্ধুর পথ পাড়ি দেবার ইতিহাস। সরকারের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন এটি একটি বড় অর্জন। আর এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সাহসী ও অগ্রগতির উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে যার মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে পূর্ণতার পথে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ৫০ বছরেরও কম সময়ে কিভাবে একটি দেশ উন্নতির রোল মডেল হিসেবে উঠে আসছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তার বাস্তব প্রমাণ। বাংলাদেশ সরকারের গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, এসডিজি অর্জন, এমডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টিরও বেশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্পে রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক প্রমাণ করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের তলাবিহীন ঝুড়িটাকে আরও একধাপ পূর্ণ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে রূপ দিতে সরকার হাতে নিয়েছে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ। সেই প্রত্যয়কে সামনে রেখে ৪৫৫০টি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। প্রতিটি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেট সেবার আওতায়। চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট এবং ই-ব্যাংকিং সেবা। বাংলাদেশের আর একটি বড় অর্জন কৃষিতে। প্রায় ১৬ কোটি জনগোষ্ঠী খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেবার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো—শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেবার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি ব্যবস্থা।
প্রযুক্তি জগতে নারীদের প্রবেশকে সহজ করতে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রের মতো ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবায় উদ্যোক্তা হিসেবে একজন পুরুষের পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন নারী উদ্যোক্তাকে। এইভাবে প্রতিটি সেক্টরেই যেন উন্নতির ছোঁয়া লেগেই আছে। তলাবিহীন ঝুড়িটি যেন আস্তে আস্তে ভরে উঠছে। সুতরাং কে কি বলেছে আমরা জানি না। বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি আমরা মানি না। কি নেই আমাদের দেশে? আমরা আরএমজি সেক্টরে দ্বিতীয়, আমাদের আছে উচ্চ প্রযুক্তিগত স্যাটেলাইট, নারী ক্ষমতায়নে আমরা বিস্ময়। চলুন, হেনরি কিসিঞ্জারকে আমন্ত্রণ জানাই বাংলাদেশে। দেখিয়ে দেই আমরা তলাবিহীন ঝুড়ি নই— আমরা নতুন বাংলাদেশের পথে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
