গুড বাই ডিউক অব এডিনবারা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫৯

ভারত তখন ব্রিটিশরাজ হইতে স্বাধীন হইয়াছে মাত্র। ইহার তিন মাস পাঁচ দিন পর ব্রিটিশ রাজপরিবারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শুভ পরিণয়ের উত্সব শুরু হয়। দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর। প্রিন্স ফিলিপ এবং প্রিন্সেস এলিজাবেথের বিবাহের ঘটনাটি কতখানি তাত্পর্যপূর্ণ, তাহা ছোট্ট একটি তথ্যই যথেষ্ট। তাহাদের শুভ পরিণয়ের অভিনন্দন জানাইয়া বাকিংহাম প্রাসাদে সারা বিশ্ব হইতে সেই সময় ১০ হাজারের বেশি টেলিগ্রাম আসিয়াছিল। বিভিন্ন রাষ্ট্র তাহাদের জন্য আড়াই সহস্রাধিক উপহার পাঠায়।

ফিলিপ ছিলেন গ্রিসের রাজপরিবারের সন্তান। তবে রাজপরিবার অভ্যুত্থানের মুখে প্রিন্স ফিলিপের পরিবার দেশ ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলে তাহাদের আশ্রয় মিলে ইংল্যান্ডে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নৌবাহিনীর ক্যাডেট হিসাবে দায়িত্ব পালনের সময় ফিলিপ মন জয় করেন ইংল্যান্ডের ভবিষ্যত্ রানি প্রিন্সেস এলিজাবেথের। অনেক বিতর্কের পর তাহাদের বিবাহ হয় বটে, তবে ব্রিটেনের রাজকীয় ব্যাপার বলিয়া কথা। প্রিন্স ফিলিপকে তাহার যাবতীয় স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়াই ব্রিটিশ রাজপরিবারের সহিত যুক্ত হইতে হইয়াছিল। বিবাহের সময় তাহাকে কেবল জাতীয়তা ও নাগরিকত্বই পরিবর্তন করিতে হয় নাই, তাহাকে নিজের নাম পালটাইয়া মাউন্টব্যাটেন রাখিতে হয়। তিনি মজা করিয়া বলিয়াছিলেন যে, তিনি ইংল্যান্ডে একমাত্র বাপ যে তাহার ছেলেমেয়েকে নিজের পিতৃপরিচয়ে পরিচিত করাইতে পারেন না। ১৯৫২ সালে রানি এলিজাবেথ সিংহাসনে আসীন হইবার পর প্রিন্স ফিলিপ নিষ্ঠার সহিত তাহার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন ২০১৭ সাল অবধি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ২২ হাজার ২১৯টি একক সরকারি কর্মসূচিতে অংশ লইয়াছেন। রয়্যাল মেরিনসহ ৭৮০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক, প্রেসিডেন্ট অথবা সদস্য প্রিন্স ফিলিপ ৬৩৭ বার বিদেশ সফর করিয়াছেন এবং বক্তব্য দিয়াছেন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। মজার ব্যাপার হইল, প্রিন্স ফিলিপকে অনেকেই রাগী মনে করিলেও প্রকৃতি এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণে তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। আর এই খ্যাতির মধ্যে কিছু বিতর্কও রহিয়াছে। এমনি একটি বিতর্কিত কাণ্ড করেন ১৯৬১ সালে। সেই সময় তিনি ভারত সফরে গিয়া একটি বাঘ শিকার করেন এবং সেই বাঘের সহিত ছবিও তুলেন। যদিও সেই সময় বাঘ সংরক্ষণ লইয়া বিশ্বব্যাপী এত সচেতনতা না আসিলেও বিষয়টি ফিলিপের কাজের স্ববিরোধ হিসাবে বিতর্ক তুলে।

রানির জীবনসঙ্গী হইলেও প্রিন্স ফিলিপের কোনো সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল না। তবে রানির আদেশেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে একসময় তিনি হইয়া উঠেন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এই দীর্ঘ সময় ধরিয়া রানি ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি একনিষ্ঠ সহযোগিতার জন্য তিনি প্রভূত শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করিয়াছেন। নিজে নবতিপর হইলেও তারুণ্য ছিল তাহার চেতনার গভীরে। সারা জীবনই তরুণদের প্রতি ছিল তাহার বিশেষ পক্ষপাত। তরুণদের উন্নতি ও বিকাশের বিষয়ে তিনি সেই ১৯৫৬ সাল হইতে ব্যাপকভাবে সফল একটি উদ্যোগ চালু করেন, যাহার নাম ‘ডিউক অব এডিনবারা অ্যাওয়ার্ড’। তিনি মনে করিতেন, তরুণরা যদি কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য দেখানোর সুযোগ পায়, তাহা হইলে সেই সাফল্যের অনুভূতি তাহারা অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত করিতে পারিবে। সারা বিশ্বে প্রতিবন্ধীদের জন্য তাহার উত্সাহব্যঞ্জক সবিশেষ কর্মকাণ্ড আমাদের অনেককাল বিমোহিত করিয়া রাখিবে।

গতকাল ৯ এপ্রিল ৯৯ বত্সর বয়সে প্রিন্স ফিলিপের মহাপ্রয়াণে আমরা ব্যথিত ও শোকাভিভূত। গুড বাই ডিউক অব এডিনবারা। রেস্ট ইন পিস।