এম এ আলআমিন
নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বৈশ্বিক মুক্তির লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। এটি আরেকটি শীতল যুদ্ধ যুগের ইশারা বলে অনেকে মনে করেন। কেউ কেউ এর সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের জমানার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। ট্রুম্যান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। তার সময় বিশ্ব শীতল যুদ্ধ যুগে প্রবেশ করে। ১৯৪৭ সালের ১২ মার্চ কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ট্রুম্যান একটি ভাষণ দেন। আশা করা হয়েছিল তিনি এতে মিত্রবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিবেন। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর জয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর পরিবর্তে তিনি বললেন, ‘বিশ্ব ইতিহাসের এমন একটি সময়ে আমরা অবস্থান করছি যখন প্রত্যেকটি দেশের মুক্ত অথবা নিপীড়নমূলক কোনো একটি জীবন ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সময় এসে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই জোরালভাবে মুক্ত বিশ্বের পক্ষে থাকবে।’ সংক্ষেপে এই হলো ট্রুম্যান ডকট্রিন।
নির্বাচনি প্রচারকালে বাইডেন ধারণা দেন তিনি মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এগোবেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো বহু পাক্ষিক চুক্তিগুলোতে আবার ফিরে আসবেন। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রদের এক সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দেশটি। একটি প্রচার সমাবেশে বাইডেন বলেছিলেন, ‘আমরা শক্তির মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে চাই না, বরং উদাহরণের শক্তির মাধ্যমে এগোতে চাই।’ দেশের ভেতর এবং বাইরে তিনি একজন ঐক্যবদ্ধকারী ও সমম্বয়কারী হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্তু হোয়াইট হাউজে ঢোকার পর তিনি দেখতে পান তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ চীন। চীন অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু দেশটি গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে না। বিশ্ব এখন এক দিকে গণতান্ত্রিক দেশ ও অন্যদিকে একনায়ক শাসিত দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে এগিয়ে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
বাইডেন ইতিপূর্বে বারাক ওবামার প্রশাসনে আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তাকে এখন ওবামা যুগের ধারাবাহিকতা মনে করলে ভুল হবে। বাইডেন যে সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন তার আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ এখন কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয় বরং বাস্তব। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় রাজনৈতিক মেরুকরণ চরম আকার ধারণ করে। বর্ণবাদও ক্রমশ মাথাচাড়া দিচ্ছে। চীনের প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি দুশ্চিন্তা। পরিস্থিতি এখন শীতল যুদ্ধ যুগের সূচনালগ্নের মতো। ৩ মার্চ বাইডেন প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল পরিকল্পনা প্রকাশ করে। ২৩ পৃষ্ঠার ঐ পরিকল্পনায় চীন ও রাশিয়ার প্রভাব সামনে রেখে ন্যাটো শক্তিশালীকরণ, ইন্দো প্যাসিফিক জোটকে কার্যকরসহ মিত্রদের মধ্যে সহযোগিতা আরো বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অনেকটা ট্রুম্যানের মতো বাইডেন বলেন, ’ভবিষ্যত্ বিশ্বের দিশা নির্ধারণে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একনায়কতন্ত্রই সেরা উপায়, এ মতের সমর্থক যেমন আছে। তেমনি গণতন্ত্রকেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সঠিক উপায় মনে করা ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর উদ্বোধনী ভাষণে পররাষ্ট্রনীতির বিশদ বিবরণ বাইডেন দেননি। তার প্রশাসনের পক্ষে দেশের ভেতর ও বাইরের হুমকিগুলো আলাদা করা সম্ভব ছিল না। যাই হোক সদ্য প্রকাশিত নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়। সর্বসাধারণের কাছে তিনি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। যেমন—ঘৃণা, বিদ্বেষ, সহিংসতা, চরমপন্থা ইত্যাদি। লক্ষণীয় নৈতিকতা ও গণতন্ত্র উদাহরণ তৈরির দাবি রাখে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি আদর্শভিত্তিক করতে হলে তা আরো বেশি প্রয়োজন। ৭০-এর দশকে জিমি কার্টার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মানবাধিকারকে তার পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি করেন। বিষয়টি ছিল কার্টার প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নিক্সন-কিসিঞ্জার যুগের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল কমিউনিজম ঠেকাও। একই সময় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছিল মার্কিন রাজনীতি। তাই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনাই ছিল তখন সময়ের দাবি। লক্ষণীয় তখনকার অবস্থার সঙ্গে বর্তমান অবস্থার মিল আছে। বাইডেন ট্রাম্পের পর ক্ষমতায় এসেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো—তিনি দেশের ভেতর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করেছেন এবং বাইরে তিনি একনায়কদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছেন। বাইডেনের সামনে তাই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ এসেছে।
