শিফারুল শেখ
লন্ডনের ডেইলি মিরর পত্রিকা প্রিন্স ফিলিপের কাজিন লেডি মাইরা বুটারের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ পুরো পৃথিবীটাই হারিয়েছেন। মার্কিন মিডিয়া সিএনএন লিখেছে, রানি কেবল তার স্বামীকে হারাননি, ঘনিষ্ঠ জীবনসঙ্গীকে হারিয়েছেন। যিনি তার একান্ত ও বিশ্বস্ত একজন উপদেষ্টা ছিলেন। ডেইলি মেইল লিখেছে, প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যু রানিকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রানি হয়তো এবার রাজসিংহাসন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু রাজপরিবারের দিকে নজর রাখেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ভালোবাসার ৮১ বছর
রাজপরিবারের একজন একান্ত সচিব একবার বলেছিলেন, সারা বিশ্বে প্রিন্স ফিলিপ একমাত্র মানুষ যিনি রানিকে নেহায়েত অন্য একজন মানুষ হিসেবে দেখেন, সেভাবেই তার সঙ্গে ব্যবহার করেন। একমাত্র তিনিই এটা করতে পারেন’। তাদের বিয়ে ছিল প্রেমের। তারা দুজন দুজনকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। তাদের দেখা হয়েছিল বিয়ের অনেক আগেই, ১৯৩৯ সালে। প্রিন্স ফিলিপ তখন ১৮ বছরের সুদর্শন চনমনে নেভাল ক্যাডেট। বাবা-মার সঙ্গে ঐ কলেজ সফরে গিয়ে ১৩ বছরের রাজকুমারী এলিজাবেথের নজর কাড়েন তিনি। প্রিন্স ফিলিপ এবং রানির বিয়ে হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। ১৯৫২ সালে তারা যখন কেনিয়ায় তখন প্রিন্স ফিলিপই স্ত্রী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে খবর দেন যে, তার (এলিজাবেথ) বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা গেছেন এবং তিনিই ২৫ বছর বয়সে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের রানি হচ্ছেন।
৯৪ বছরের রানি তার ৯৯ বছর বয়সি স্বামী প্রিন্স ফিলিপকে হারিয়েছেন গত শুক্রবার সকালে। তাই ৭৩ বছরের বিশ্বস্ত সঙ্গীকে দ্রুত হারাতে হবে এমন একটা মানসিক প্রস্তুতি রানি নিয়ে রেখেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানিয়েছে। তবে তাই বলে এতদিনের সঙ্গীকে হারিয়ে শোক কি সহজেই কাটানো যায়? এক কথায় ‘না’। তিনি আট দিনের শোক পালন করছেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথ রানি হলেও প্রিন্স ফিলিপ কিন্তু ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের রাজা ছিলেন না। তবে স্পষ্টবক্তা প্রিন্স ফিলিপ যে রানির মনের রাজা ছিলেন তা তাদের ৭৩ বছরের জীবনযাত্রা দেখেই সহজে বোঝা যায়। যাযাবর রাজকুমার এবং লাজুক রাজকুমারী এক সময় একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠেন।
রাজসিংহাসন ছাড়ছেন না
দীর্ঘদিনের সঙ্গী পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেও রাজপরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মানে এই নয় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘদিন রাজসিংহাসনের দায়িত্ব পালন করা ৯৪ বছর বয়সি রানি তার মুকুট ত্যাগ করবেন। রানির পরে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবেন তার ছেলে প্রিন্স চার্লস। রাজপরিবার বিষয়ক ঐতিহাসিক হুগো ভিকারসন বলছেন, ‘আমি এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মুকুট ত্যাগ করবেন না। কারণ রানির স্বাস্থ্য এখনো ভালো এবং তার ভাগ্যও ভালো। তিনি যতদিন সম্ভব আমাদের রানির দায়িত্ব পালন করেই যাবেন।’ করোনার কারণে রানি তার অফিসিয়াল দায়িত্ব দূর থেকেই পালন করবেন। এমনকি স্বামী যখন হাসপাতালে ছিলেন তখনো তিনি তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন বলে হুগো জানান।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মুকুট ত্যাগ না করার কারণ আছে। ১৯২৬ সালে রানি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন কিন্তু তার রানি হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তার চাচা অষ্টম এডওয়ার্ড আমেরিকান নারী (ডিভোর্সি) ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারের মর্যাদা হারিয়েছিলেন। তখন সাংবিধানিক সংকট দেখা দিয়েছিল। কারণ এর আগে মেয়েদের রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়টি আইনে ছিল না। রাজা ষষ্ঠ জর্জ দ্বিতীয় এলিজাবেথের ১০ বছর বয়সে আইন পাশ করেন যাতে মেয়েকে উত্তরাধিকারী হওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে রানি হওয়ার আগেই ২১তম জন্মদিনে এলিজাবেথ বলেছিলেন, এই চাকরি তো সারাজীবনের। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের সামনে ঘোষণা করছি যে, আমার জীবন সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ যেটাই হোক না কেন আমি আজীবন আপনাদের এবং রাজপরিবারের সেবায় নিয়োজিত থাকব।’ রাজসিংহাসনে বসার ৬০তম বার্ষিকীতেও রানি একই অঙ্গীকার করেছিলেন। তখন বাকিংহাম প্যালেসের এক শীর্ষ সহযোগীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রানির মুকুট ত্যাগ করার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না। তার জবাব ছিল, ‘লাইফ মিনস লাইফ’ বা ‘মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত’। অর্থাত্ তিনি ইউরোপিয়ান রাজা-রানিদের মতো সরে দাঁড়াবেন না। স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোস ২০১৪ সালে, বেলজিয়ামের রাজা আলবার্ট এবং নেদারল্যান্ডসের রানি বিট্রিক্স ২০১৩ সালে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন।
রানিকে ভালোভাবে চেনেন এমন ভাষ্যকররা বলছেন, ধর্মের প্রতি অনুরাগী এবং চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাজ্যাভিষেক দিবসে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা থেকে সরে দাঁড়াবেন না। তবে তিনি হয়তো নিজের কাজের চাপ কমাতে কঠিন দায়িত্বগুলো ৭২ বছর বয়সি ছেলে প্রিন্স চার্লস এবং রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। গত এক দশক ধরে তিনি অনেক আন্তর্জাতিক সফর বাতিল করেছেন, অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অন্য সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। রাজপরিবার বিষয়ক ইতিহাসবিদ রবার্ট ল্যাসির মতে, ‘রানি হয়তো কিছুটা পিছু হটতে পারেন এবং প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্স উইলিয়ামকে আমরা প্রতিনিধিত্বশীল কাজে দেখতে পারি। রানি তার জায়গাতেই থাকবেন’। ইতিমধ্যে আগামী বছর রানির রাজসিংহাসনে বসার ৭০তম বার্ষিকীর পরিকল্পনার ঘোষণা সরকার দিয়ে দিয়েছে বলে রবার্ট ল্যাসি স্মরণ করিয়ে দেন।
