ক্যাঙ্গারু মা সেবায় বাঁচবে শত প্রাণ

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২২:০৮

শান্তার বয়স ১৮ বছর। ১৮ দিন যাবত্ সে তার দ্বিতীয় সন্তান নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কারণ এই বাচ্চাটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নিয়েছে। তার প্রথম বাচ্চার বয়স দুই বছর। ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। তাকে সুস্থ রাখার জন্য এখন আর যান্ত্রিক ইকুইবেটর সেবা নয় বরং মায়ের শরীরের সাথে যুক্ত করে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ বা কেএমসি সেবা দেওয়া হচ্ছে। মা তার বাচ্চাকে ঠিক ক্যাঙ্গারুর মতো বুকে নিয়ে ঘুরছেন। এ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। একই অবস্থায় পাওয়া গেল নাজনিন নাহার রুমাকে। হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে একই অবস্থায় পাওয়া গেল ছয়জন মাকে।

নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক মো: মাহবুবুল হক জানান, ৩৭ সপ্তাহ আগে জন্ম নেওয়া শিশুকে অপরিণত শিশু বলা হয়। এ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কারণ তার দেহের তাপমাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ হয় না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় দ্রুত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে পারে না। শ্বাসরুদ্ধতার ঝুঁকি থাকে, মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। ২ হাজার গ্রামের কম এবং ১৮শ’ গ্রামের ওপরে শিশুর ওজন হলে তাকে কেএমসি সেবা দেওয়া হয়। এসকল মাকে আগে ‘বিশেষ ‘ইকুইবেটর’ এ রাখা হত, যা ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে-২০১৪ মতে শিশু মৃত্যুর ৬১ শতাংশ ঘটে ৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ অপরিণত নবজাতক। বর্তমানে জন্ম নেওয়া প্রতি হাজার জীবিত শিশুর মধ্যে মৃত্যুর হার ১৮। এসডিজি অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। ১৪ শতাংশ অপরিণত নবজাতক জন্ম নেয়। এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ১৭ নভেম্বর দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ক্যাঙ্গারু মা সেবা দিবস-২০১৮। এবছর দিবসটির প্রতিপ্রাদ্য করা হয়েছে ‘কম জন্ম ওজন ও অসুস্থ নবজাতকের যত্নে পরিবারকে নিয়ে কাজ করি’। ১৯৭৮ সালে কলোম্বিয়ার রাজধানী বোগটায় যা. এডগার রে এবং মর্টিনেজ এই সেবা পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এম.এ.কে আজাদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৬ সাল থেকে তাদের হাসপাতালে এ সেবা চালু হয়। প্রচলিত কিছু কুসংস্কার, যেমন গর্ভাবস্থায় কম খেলে নবজাতক ছোট হবে প্রসব সহজ হবে। এই সকল কুসংস্কার দূর করাসহ সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেন তিনি।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সরকার চতুর্থ হেলথ পপুলেশন নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম (৪র্থ এইচপিএসএসপি ২০১৭-২০২২) গ্রহণ করেছে বলে জানান পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের পরিকল্পনা পরিচালক ডা. ফরিদউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, জাতীয় নবজাতক স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নামে এই পরিকল্পনায় অপরিণত নবজাতকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে ২০২২ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২শ’টি এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৭০টি কেএমসি সেবাদান কেন্দ্র করা হবে। এরই মধ্যে ৪টি চালু হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ আরও ৩৫টি চালু হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সরকার এই খাতে ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেন ও জাতিসংঘ শিশু উন্নয়ন বিষয়ক তহবিল ইউনিসেভ তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে। আজিমপুর ও মোহাম্মদপুরে দুটি হাসপাতাল এর আওতায় আছে। তিনি বলেন, কেএমসির ফলে ৫৫ শতাংশ সংক্রমণের হার কম, মায়ের বুকের কাছে থাকে বলে শিশুকে দুধ খাওয়ানো সহজ হয়, শিশু দ্রুত বেড়ে উঠে, মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে তার শ্বাস-প্রশ্বাস সচল থাকে বলে শ্বাসরুদ্ধতার ঝুঁকি থাকে না, সর্বোপরি মা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়। মৃত্যু ঝুঁকি কম। সাফল্য শতভাগ। তাই সরকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সেবা ছড়িয়ে দিতে এরইমধ্যে ২হাজার ৫৯ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আরও প্রশিক্ষণ চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেল ও নবজাতক স্বস্থ্যসেবা লাইন ডিরেক্টর ডা, সুলতান মো: সামসুজ্জমান বলেন, সরকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে নবজাতক মৃত্যু হার কমাতে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কেএমসি সফলতা বিষয়ে মানুষকে জানানো ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কাজ করছেন তারা।