পিতলের বড়ো বর্তনে সাদা রঙের পাউডার নিয়ে, তাতে নারকেল তেল ঢেলে পাকা হাতে মিশিয়ে নিচ্ছেন বর্ষীয়ান মেকাপম্যান রন সাহা। গত রাত থেকে সংক্রান্তির সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন তারা, তবে চৈত্র সংক্রান্তির পাঁচ দিন আগে থেকে শুরু হয় দোলকাচ নামের সংক্রান্তি উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিকতা। সংক্রান্তির দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় শিব আর পার্বতী সাজের কাজ। এই আয়োজন শুধু বিক্রমপুর আব্দুল্লাহপুরেই দেখা যায়।
সাদা রঙে সাজানো হয় শিব ঠাকুরকে। শিব আর পার্বতীর সাজ শেষ করে মন্ত্র আর ধূপছায়ায় তাদের পাঠানো হয় দোলকাচে। শিব-পার্বতী সারা পাড়া ঘুরে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণের আশ্বাস দিয়ে ঘরে ফেরেন।
শুরু হয় লালকাচের মেকাপ। সিঁদুরের পাউডার নিয়ে তা নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে, খালি গায়ে একটা হাফপ্যান্ট পরে, একজনের পর একজন বসেন, সারা শরীর মেকাপ দিয়ে লাল অবয়ব দেওয়ার পর, আরেকজন এসে বসছেন। রং মাখা শেষ হলে মাথায় রঙিন কাগজের মালা পরানো হয়, মুখে জবা ফুল আর হাতে তলোয়ার। পরনে থাকে সাদা রঙের হাফপ্যান্ট, কোমরে এবং ঊরুতে বেঁধে দেওয়া হয় লাল সালু কাপড়। রওয়ানা দেন কাচনৃত্যে। দলপতির বা সন্ন্যাসীর হাতে থাকে একটা মাথার খুলি, তার তান্ত্রিক শক্তির মূল উত্স এই খুলি। সন্ন্যাসী ঠাকুর ব্যতীত অন্য কেউ এই খুলি ধরলে হবে মহা অনাচার।
খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে তলোয়ার উঁচিয়ে দলের সবাই নাচতে থাকে। এলাকার প্রতিটি পাড়া থেকে নামে একটি করে দল। নাচতে নাচতে দলগুলো চলে যায় এলাকার শ্মশানে। সেখানে নেচে আবার বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ির মাঠে এক ভয়ংকর যুদ্ধ হয় কাচের দল আর মহাদেবের মধ্যে। মহাদেবের কাছে হার স্বীকারের মধ্য দিয়ে কাচনৃত্যের সমাপ্তি ঘটে। ধরণীর সব বর্বরতা, অনাচার আর হিংসা দূর করতেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
অংশগ্রহণকারীরা সন্ন্যাসীবাড়ির পুকুরে পরিষ্কার ও পূত-পবিত্র হয়ে বাড়ি ফিরে এলে শুরু হয় শিব পূজার প্রস্তুতি। রাতে হয় শিব পূজা। এই পূজার মধ্য দিয়ে বছরের দোলকাচ, লালকাচ আর কাচনৃত্যের সমাপ্তি হয়। পরদিন সকালে পূত দেহে নতুন বছরকে বরণ করে নেন তারা।
বিক্রমপুরে সংক্রান্তিকে স্বকান্দা বলে। মন্ডলবাড়ির সন্ন্যাসী ঠাকুরের লালকাচের দলের নাম-ডাক দশগ্রামে। প্রবীণ সন্ন্যাসী অমৃত গোস্বামী। এক শ্লোকে সাতপুরুষের নাম বলে যেতে পারেন—যারা নাকি লালকাচ করতেন। অমৃত গোস্বামী বলেন, শয়তান, বজ্জাত, পাপী-তাপীকে উদ্ধার করতে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর উদয়। দস্যু ধ্বংস করার জন্য মহাদেবের উদয় হয় এই দিনে।
এই যে দস্যু ধ্বংস, একসময় ব-দ্বীপীয় ধনভাণ্ডার বিক্রমপুরে ঘন ঘন হার্মাদ-জলদস্যুর হামলা হতো। অনেকে ধারণা করেন, নিজেদের ক্ষমতা বা বল প্রদর্শন করা ছিল এই লালকাচের উদ্দেশ্য। আদিপত্যবাদীদের ভয়ে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে যে চড়ক পূজা হতো তাকে উপলক্ষ করে নিজেদের যুদ্ধ মোকাবেলায় সক্ষমতার জানান দেওয়াই ছিল এই লালকাচের মূল বিষয়।
যে কারণেই প্রচলিত হয়ে উঠুক না কেন, এই লালকাচ, কালীকাচ ও কালীনৃত্যের আছে ঐতিহাসিক পরম্পরা। ফোকলোর সাধক আশুতোষ ভট্টাচার্যের ‘লোক-সঙ্গীত রত্নাকর’ বইয়ের ‘বঙ্গীয় লোক-নৃত্যকোষ’ অধ্যায় থেকে লালকাচ-এর পৌরাণিক রূপের প্রমাণ পাওয়া যায়।
১৮ শতকে তাঁর দেখা লালকাচ নিয়ে বলেছেন, ‘পাত্র-পাত্রীর বেশ ধারণ করিয়া নৃত্য করিবার নাম কাচনৃত্য।’ তিনি লালকাচের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করতে ‘চৈতন্য ভাগবত’-এ ভুক্তি হাজির করেছেন। ‘‘চন্দ্রশেখর আচার্যের গৃহে শ্রীচৈতন্য এই নৃত্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন বলিয়া ‘চৈতন্য ভাগবত’-এ উল্লেখিত আছে।’’
সদাশিব বুদ্ধিমন্ত খানেরে ডাকিয়া।
বলিলেন প্রভু, কাচ সজ্জ কর গিয়া।।
... ... ...
সত্বরে চলহ বুদ্দিমন্তখান তুমি।
কাচ সজ্জ কর গিয়া নাচিবাঙ আমি।।’ ( মধ্যলীলা)
এ তো গেল লালকাচের প্রাচীনতার প্রমাণ। কাচনৃত্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যের সাজসজ্জা গ্রহণ করিয়া নৃত্য করিবার নাম কাচনৃত্য। এ নৃত্যে কোন সাজসজ্জা গ্রহণ করিবার প্রয়োজন হয় না।’
একই বইতে কালীনৃত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘কাষ্ঠ নির্মিত মুখোশ পরিয়া হাতে তরবারী লইয়া ধীর লয়ে কালী নৃত্য করে। নৃত্যকারী বালকের উপর কালীর ‘ভর’ হয় বলিয়া বিশ্বাস।’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘কালীর রূপ ধারণ করিয়া তাঁহার অসুরের সঙ্গে সংগ্রাম করিতে করিতে যে নৃত্য প্রদর্শিত হয়, তাহা পূর্ববঙ্গে বিশেষত ঢাকায় কালীকাচ। কালীর সঙ্গে অসুরের যুদ্ধ নৃত্যের ভিতর দিয়া প্রধানত প্রকাশ করা হইয়া থাকে।’
লালকাচ, কালীকাচ আর কালীনৃত্য সুপ্রাচীন এবং ঐতিহাসিক। শ্রী চৈতন্য ভাগবত-এ এর উল্লেখ আছে।
