বর্ণ যখন কথা বলে

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২১:০৯

আমরা যারা গত সহস্রাব্দের মধ্য-চল্লিশে জন্মেছি তারা সম্ভবত সবাই বাংলা বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়েছি সীতানাথ বসাক-এর আদর্শ লিপি ও সরল বর্ণ পরিচয় শিশুপাঠের মাধ্যমে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের বাংলা সংখ্যানির্দেশ, ইংরেজি বর্ণমালা এবং ইংরেজি সংখ্যানির্দেশও ঐ একই বই থেকে শেখা। এই শিশুপাঠ্যের মাধ্যমেই আমাদের চরিত্র গঠনেরও প্রথম পাঠ। এখনো মনে গেঁথে আছে এই দুটি বাক্য : অসত্ সঙ্গ ত্যাগ কর, আলস্য দোষের আকর।

সীতানাথ বসাক থেকে হরষিত বালা—একটি লম্বা সময়, যে সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মীয়বোধ এবং দেশের মানচিত্রই শুধু বদলায়নি আমাদের নতুন প্রজন্মের চারিত্র্যও পালটে গেছে। আমরা বারংবার বলছি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আমাদের চরিত্রগঠনের দূরত্বটা এতটাই বেড়েছে যে চারদিকে অবক্ষয়ের জয় নিনাদ স্পষ্ট শ্রুতিগোচর হচ্ছে। আমরা এর কারণ অনুসন্ধানে তেমন উদ্যোগী নই কারণ দেশটার অবিশ্বাস্য জাগতিক উন্নতি তো হচ্ছে! আমরা আগের চাইতে অনেক অনেক সচ্ছল ও উন্নত জীবনযাপন করছি, তাহলে এত নীতিবোধ নিয়ে বিড়ম্বিত হব কেন? সহজ জীবনযাপন এবং উন্নত চিন্তা আজ প্রায় অস্তগামী সারা বিশ্বেই।

হ্যাঁ, হরষিত বালা সম্প্রতি সীতানাথ বসাক-এর মতোই একটি শিশুপাঠ্য রচনা করেছেন। পাঠ্যটির নাম ‘আমার বর্ণ যে-কথা বলে’। বইটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ, ঢাকা। আমি আগেই বলেছি সময় অনেক কিছু বদলে দেয়। যারা আদর্শ লিপি পড়েছেন বা দেখেছেন তারা নিশ্চয় জানেন এই বইটি বড়ই দীনহীন মলিনভাবে মুদ্রিত—যদিও ঐ সময়ে তেমনটাই প্রচল ছিল—প্রচ্ছদ আকর্ষণহীন, কাগজ নিম্ন মানের, অক্ষরবিন্যাস হাতে করা, কোন ছবি ছিল বলে মনে পড়ছে না, থাকলে ব্লকে প্রস্তুত, এবং মুদ্রণে কোনো রং ব্যবহার করা হয়নি। শিশুপাঠ্যটির বিষয়বস্তু সর্বজনীন। অন্যদিকে হরষিত বালা-র ‘আমার বর্ণ যে-কথা বলে’ একটি অত্যন্ত আধুনিক মুদ্রণ।

কিন্তু মানতেই হবে হরষিত এই বর্ণময় আধুনিকতার মাধ্যমে একটি সুন্দর শিশুপাঠ্য প্রস্তুত করেছেন। বাংলা বর্ণের সাথে বাঙালির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নিঃসন্দেহে। ফলে আমাদের বর্ণমালা নির্বাক নয়—এর ভেতরে এক ইতিহাস আছে, দেশপ্রেম আছে, ছন্দ আছে, গান আছে, পরিবেশ আছে যা বিশ্বের অন্য সব ভাষা থেকে ভিন্নতর। হরষিত ঠিক এদিকেই মনযোগী হয়েছেন এবং বলতে হবে সঠিকভাবেই হয়েছেন।

পাঠ্যটিকে হরষিত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন : প্রথম পড়া (শিশুদের ছোটবেলার পাঠ); দ্বিতীয় পড়া (শিশুদের বড়োবেলার পড়া); এবং দেশের ছবি। প্রথম ভাগের পাঠ অংশ ১ এবং ২ শিশুদের পরিচিত করেছে স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে। সীতানাথ বসাক-এর ‘আলস্য দোষের আকর’ হরষিতে পরিবর্তিত হয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে স্বরবর্ণের আদ্যাক্ষর অ-এর নীতিবাক্যে : অলসতা ভাল নয়। বলতেই হবে শিশুদের জন্য নীতিকথাটি সহজবোধ্য হয়েছে। এমন আরো বেশকিছু সহজবোধ্য অথচ গভীর অর্থপূর্ণ নীতিবাক্যের উদাহরণ :আলো আছে হবে জয়; ইতিহাস কথা কয়। এছাড়া রয়েছে প্রতিবেশ সচেতনতার পাঠ।

বইটির দ্বিতীয় পড়া-র দুটি পাঠ অংশে হরষিত যুক্তবর্ণের শিক্ষা দিয়েছেন যদিও তিনি এটি বিভাজন করেছেন স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের ভিত্তিতে। যেমন স্বরবর্ণে রয়েছে : ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ দুর্বলেরে বল/অন্নহীনে অন্ন দাও তৃষ্ণার্তকে জল। এবং ব্যাঞ্জনবর্ণে : ক-বলতে কর্ম বুঝি, কর্ম ধ্যান-জ্ঞান/কর্ম করলেই তবে আত্মার কল্যাণ; খ-বলতে খ্যাতিমান দেশপ্রেমী হবে/তবেই জগত্ জুড়ে কীর্তি বেঁচে রবে। এই দুটি অংশে হরষিত যতটা আদর্শ, নীতিবোধে এবং দেশপ্রেমের কথা বলেছেন ততটা আগের দুই অংশে বলেননি এবং এর কারণ সহজেই অনুমেয়—এই অংশটি বড়োবেলার পাঠ।

পাঠ্যটির সবশেষ অংশ হলো একটি দেশাত্মবধক কবিতা—দেশের ছবি। পুরো বইটিই ছন্দবদ্ধ এবং ছন্দের মাধ্যমে বর্ণ, আদর্শ, নীতি, দেশপ্রেম এবং প্রতিবেশ শিক্ষা প্রদানের প্রচেষ্টা লেখক হরষিত বালা করেছেন। বইটির একটি সম্ভাব্য দুর্বলতা হতে পারে হরষিত বালা প্রায় সব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ জীবন এবং পরিবেশের চিত্র তুলে ধরেছেন। শহর তার অলোচ্যসূচিতে স্থান পায়নি ফলে শহুরে শিশুরা বিচ্ছিন্নতাবোধে ভুগতে পারে। তবে সার্বিকভাবে আমার বর্ণ যে-কথা বলে একটি সুচিন্তিত, সুলিখিত, সুমুদ্রিত এবং সময়োচিত শিশুপাঠ্য।