চুনোপুঁটি ও রাঘব বোয়ালের গল্প

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৫

দুর্নীতি শব্দটি ভীষণভাবে প্রচলিত। কিন্তু ইহা আসলে কী জিনিস? ‘দুর্নীতি’কে সন্ধিবিচ্ছেদ করিলে দাঁড়ায় দুঃ+নীতি। আভিধানিক অর্থে দুর্নীতি হইল ‘কুনীতি’ তথা নীতিবিরুদ্ধ কাজ। প্রবাদ আছে—সুযোগের অভাবে সত্। অর্থাত্ সুযোগ পাইলে সকলেই যেন অসত্ হইয়া যাইত। যদিও ইহাকে সর্বাংশে সত্য মনে করিবার কোনো কারণ নাই। দর্শনের ভাষায় পৃথিবীতে কেহই আপাদমস্তক সত্ হইতে পারেন না, আবার কেহই আকণ্ঠ অসত্ হইতে পারেন না। অর্থাত্ শতভাগ সাদা ও শতভাগ কালো বলিয়া কিছু নাই। ইহা আসলে সাদা-কালোর মিশ্র দুনিয়া—কোথাও সাদার অংশ বেশি, কোথাও কালোর। কাহারো নীতির মধ্যে কিছুটা কালোর আধিক্য থাকিলে তাহাকে সহজভাষায় দুর্নীতিপরায়ণ বলা হয়। ইহারা চুনোপুঁটি ধরনের। ইহাদের ধরা সহজ, মুঠোর মধ্যে একটিবার আটকাইয়া গেলে আর রক্ষা নাই। কিন্তু যাহাদের নীতির মধ্যে কালো প্রবলভাবে কর্তৃত্ব করে, তাহারা হইয়া উঠেন রাঘব বোয়াল তথা অতি প্রকাণ্ড বোয়াল। এই ধরনের বোয়ালদের দুই হাতে ছাই মাখাইয়াও আটকাইয়া রাখা যায় না। সাধারণ চুনোপুঁটি ধরিবার জাল দিয়া রাঘব বোয়াল ধরিতে গেলে ওই জালখানিই ছিন্ন হইয়া যাইবে।

দুর্নীতি লইয়া সারা বিশ্বেরই ব্যাপক মাথাব্যথা রহিয়াছে। দুর্নীতির বিষয়ে রাশিয়ান কৌতুকগুলি ভাবিয়া দেখিবার মতো। রুশসাহিত্য যেমন জগদ্বিখ্যাত, তেমনি তাহাদের রসবোধও তুলনাহীন।  রাশিয়ান রসস্রষ্টারা মনে করেন—সরকারি কর্মচারীদের দৃষ্টিতে দুর্নীতি হইতেছে রূপবতী রমণীর মতো, যাহার সহিত যুদ্ধ করিবার চাইতে বন্ধুত্ব করাটা লাভজনক। কথা হইল—দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহজে জয়লাভ সম্ভব নয় কেন? তাহার কারণ নাকি এই যে, প্রায় প্রত্যেক যোদ্ধাই মনে মনে দুর্নীতিবাজ হইবার ইচ্ছা লালন করেন। বলা হইয়া থাকে, ঘুষ ব্যাপারটি অধিকাংশ লোকেরই অপছন্দ। তাহার কারণ হইল—বেশিরভাগ মানুষ ঘুষ শুধু দিয়াই যায়, ঘুষ তাহারা পায় না। দুর্নীতির বিষয়ে শেষ কৌতুকের উদাহরণ টানা যায় অত্যন্ত প্রভাবশালী এক রুশ কর্মকর্তার কাণ্ড লইয়া। একটি গাড়ি প্রদর্শনী উদ্বোধন করিতে গিয়াছেন ওই প্রভাবশালী কর্মকর্তা। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা তাহাকে পাইয়া খুবই উত্ফুল্ল। তিনি ওই কর্মকর্তাকে একটি দামি গাড়ি গিফট করিতে চাহিলেন। কিন্তু বিচক্ষণ কর্মকর্তা বিব্রত হইয়া বলিলেন—‘না না, আমি বিনে পয়সায় কিছু লইতে পারি না। ইহাতে দুর্নীতি প্রশ্রয় পাইবে।’ উদ্যোক্তা তখন বলিলেন, ‘তাহা হইলে আপনি গাড়ির দাম বাবদ আমাকে দশটি টাকা দিন।’ প্রভাবশালী ওই কর্মকর্তা খুশি হইয়া বলিলেন, ‘গ্রেট আইডিয়া। তাহা হইলে আমাকে পাঁচটি গাড়ি দিন। এই নিন পঞ্চাশ টাকা।’

দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা হইলেন কৃমির মতো, যাহারা অন্ত্রে জাঁকাইয়া বসিয়া শুষিয়া লয় শরীরের পুষ্টি আর রক্ত। গোলকৃমি, গুঁড়াকৃমি, ফিতাকৃমি, সুতাকৃমি, বক্রকৃমি প্রভৃতি কৃমির মধ্যে কিছু কিছু হইল চুনোপুঁটিতুল্য, আর কয়েকটি আছে রাঘব বোয়ালের মতো। রাঘব বোয়ালতুল্য বড় কৃমিগুলি অন্ত্রের দেয়ালে এমনভাবে মিশিয়া থাকে যেন তাহারা ওই অন্ত্রেরই অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্রেও সময়ে সময়ে তেমনটি দেখিতে পাওয়া যায়। শরীরকে রক্তশূন্য ও পুষ্টিহীন করিতে ইহাদের তুলনা চলে না।