বিভক্ত ভেনিজুয়েলা বিভক্ত বিশ্ব

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৬

ক্ষমতার রাজনীতি যে কত অঘটন ঘটাতে পারে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বর্তমান ভেনিজুয়েলা। এক দেশে একই সঙ্গে দুজন প্রেসিডেন্টের অবস্থান আর একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র বিভক্ত শাসক গোষ্ঠী। এই দ্বন্দ্ব-বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে বহির্বিশ্ব। দুই প্রেসিডেন্টের পক্ষে-বিপক্ষে ঘটছে পরাক্রমশালীদের সমীকরণ। কথায় বলে, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’— তেমনই ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ দেশটির জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন পৃথিবী আমেরিকার প্রেক্ষিতে ভেনিজুয়েলা একটি পুরনো জনপদ। ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক আমেরিকো ভেসফুসি সেখানে জনবসতি দেখেছিলেন। মারাকেইবো হ্রদের পাশের বসতিকে তিনি তুলনা করেছিলেন ভেনিস নগরীর সঙ্গে। নাম দিয়েছিলেন ছোট্ট ভেনিস। স্পেনিশ উচ্চারণের ক্রমবিবর্তনে নাম হলো ভেনিজুয়েলা। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি স্পেনের উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৮২৯ সালে ভেনিজুয়েলার বর্তমান মানচিত্র আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়। এর প্রথম প্রেসিডেন্ট হন সুপ্রশাসক জেনারেল জোস এন্টোনিও পাজ। সেই থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত ভেনিজুয়েলার ইতিহাস দ্বন্দ্ব-বিগ্রহে পরিপূর্ণ। গণতন্ত্রের নিরঙ্কুশ চর্চা হয়েছে অল্প সময়ে। সামরিক ব্যক্তিত্ব অথবা সামরিক শাসনে কেটেছে অধিকাংশ সময়।

লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের মতো এখানেও বামধারার রাজনীতি অনুভূত হয়েছে প্রবলভাবে। ১৯৯৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামধারার নেতা লে. কর্নেল হুগো স্যাভেজ ভেনিজুয়েলার নেতৃত্বে আসীন হন। স্যাভেজ ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নামকাওয়াস্তে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। এ বছরই স্যাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন নিকোলো মাদুরো। বিরোধীদের অভিযোগ হলো, তার উত্তরসূরির মতো তিনিও ২০১৮ সালের মে মাসে একটি ‘বোগাস’ নির্বাচন করেন। পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে গেলে তার রাজনৈতিক বিরোধিতা চরমে পৌঁছে। তিনি ইতোমধ্যেই ছোটখাটো কয়েকটি অভ্যুত্থান চেষ্টা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবিলা করেছেন। বিদ্রোহ দমনে তিনি সক্ষম হলেও তেতিয়ে ওঠে বিরোধীপক্ষ।

ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিরোধী জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই নির্বাচন বিরোধী পক্ষকে নৈতিক শক্তি জোগায়। পার্লামেন্টের স্পিকার হুয়ান গুয়াইদো আন্দোলনকারী জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। ভেনিজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সংকটকালীন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২৩ জানুয়ারি ২০১৯ বিরোধী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট মাদুরোবিরোধী বিক্ষোভের ডাক দেয়। সেখানে জনতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাস্তায় নেমে আসে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্পিকার হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি অচিরেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন। ভেনিজুয়েলার শহর ও জনপদে অনবরত বিক্ষোভ হচ্ছে পক্ষে এবং বিপক্ষে। এই পরিস্থিতিতে দেশটির জনগণই শুধু বিভক্ত নয়, ভেনিজুয়েলাকে ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্বও।

দৃশ্যত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর জনগণ আরও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। পুলিশের সঙ্গেও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বলছে, গত কয়েকদিনে বিক্ষোভের সময় ২৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মাদুরো সরকারকে অগ্রাহ্য করবার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভেনিজুয়েলা স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত গুয়াইদো আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। অপরদিকে মাদুরো নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি তার পক্ষে বিভিন্ন শহরে মিছিলের আয়োজন করছেন। এদিকে ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাদুরো এখনো দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট। গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দাবি করার পর বিরোধীরা বিদেশি সহায়তায় সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করাচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বার্থ হাসিলের জন্য স্পিকার নিজেকে আইন-বহির্ভূতভাবে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। সেনাবাহিনী কখনোই তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেবে না। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে মাদুরো খোলাখুলিই অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার দেশে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মন্ত্রিসভার তিনভাগের একভাগ সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখার কথা। কিন্তু বামধারার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী মাদুরো সেনাবাহিনীকে দলীয়করণ ও নিয়ন্ত্রণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজও সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, ভেনিজুয়েলা একটি চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট অতিক্রম করছে।

আগেই বলা হয়েছে, ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বহির্বিশ্ব। পরাশক্তিগুলো তাদের নিজ নিজ স্বার্থ সুবিধা, প্রভাব বলয় এবং আদর্শিক অবস্থান দ্বারা নির্ণয় করেছে তাদের সমর্থন। যেহেতু মাদুরো বামপন্থি মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত, সেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান মাদুরোর বিপরীতে। ইতোমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৩৫ বছর বয়সী গুয়াইদোর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, মাদুরো অবৈধ প্রেসিডেন্ট। ভেনিজুয়েলার জনগণ স্বাধীনতা ও আইনের শাসন চায়। যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ আরোপ করতে পারে বলে মাদুরোকে সতর্ক করেন ট্রাম্প। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এখনই সামরিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছেন না। তবে টেবিলে সব বিকল্প আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে সাড়া দিয়ে ১৪ জাতি লিমা গ্রুপের ১১টি দেশ ব্রাজিল, কানাডা, কলম্বিয়া, চিলি, পেরু, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, কোস্টারিকা, গুয়েতেমালা, হণ্ডুরাস এবং পানামা গুয়াইদোকে সমর্থন দিয়েছে। এছাড়া অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস-ওএএস গুয়াইদোর পাশে দাঁড়িয়েছে। অপরদিকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, মেক্সিকো, বলিভিয়া ও কিউবা। রুশ ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই বায়াবকভ যেকোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এরকম কোনো পদক্ষেপ নিলে তা বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। রাশিয়া অভিযোগ করছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে। সমাজতন্ত্রের পুরনো মোড়ল এবং নতুন করে বৈশ্বিক ভূমিকায় অবতীর্ণ রাশিয়ার ভূমিকাকে অনেকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। কিন্তু যা আন্তর্জাতিক মহলে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে, তা হলো ন্যাটো সদস্য তুরস্কের মার্কিনবিরোধী অবস্থান। মাদুরো ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভেনিজুয়েলা ছাড়ার জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। তবে গুয়াইদো এক টুইটে বলেছেন, তার অধীনে ভেনিজুয়েলা সরকার সব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বহাল রাখবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ সুস্পষ্টভাবে কারো পক্ষ না নিলেও অচিরেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্ভাব্য ‘সংঘাত, দুর্যোগ’ এড়াতে বিরোধী দুই পক্ষকে দ্রুত সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

ভেনিজুয়েলা সংকট নিয়ে গোটা বিশ্বে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে দুই প্রেসিডেন্টের অবস্থান এবং এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক সমীকরণ খানিকটা উত্তাপ ছড়িয়েছে সর্বত্র। অভ্যন্তরীণভাবে এবং বহির্বিশ্বে দুই প্রেসিডেন্টের প্রায় সমানে সমান অবস্থান সংকটকে দীর্ঘায়িত করবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা এমনকি বিভক্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট শান্তিপূর্ণ উপায়ে শেষ হবে না। লাতিন আমেরিকার কূটনীতিকরা বলছেন, ভেনিজুয়েলার ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নিকোলো মাদুরো শিগগির সরছেন না। এর প্রধান কারণ সে দেশের সেনাবাহিনীর জোরালো সমর্থন। রাশিয়া তার অনুসৃত সম্প্রসারণবাদী নীতির পাশাপাশি মার্কিনিদের প্রতি তাদের চির বৈরিতার কারণে মাদুরোকে অব্যাহতভাবে সমর্থন জানাবে। আর চীন তার পুঁজির প্রয়োজনে মাদুরোর পাশে থাকবে। আদর্শিক কারণে কাছের দেশ-মেক্সিকো, বলিভিয়া ও কিউবা এই তিনটি বাম সরকার শাসিত দেশ মাদুরোকে রক্ষার চেষ্টা করবে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ত্বরিত বৈঠক আহ্বান করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, বিতর্কের সময় শেষ, মাদুরো এখন অবৈধ। বিস্ময়ের ব্যাপার, ট্রাম্পের ভেনিজুয়েলা নীতিকে সমর্থন জানিয়েছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

সন্দেহ নেই নিকোলো মাদুরোর নেতৃত্বে ভেনিজুয়েলা এখন এক গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। এ সংকটটির বৈশিষ্ট্য অনন্য। দ্বিপাক্ষিক সংকটটি অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক। বহু পক্ষে বিস্তৃত হলে সমাধানের সম্ভাবনা আরও সংকীর্ণ হয়ে আসবে। ক্ষমতার এই দ্বন্দ্বে ভেনিজুয়েলার সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সারা বিশ্ব স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন। ইতোমধ্যে দেশটির বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। স্যাভেজের সময়কাল থেকে যে অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছিল তা এখন আরও দুর্ভোগের কারণ ঘটাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সকল সাহায্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। তেলসমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলার বৈদেশিক মুদ্রা যাতে মাদুরোর হাতে না যায়—সেসব বিষয়ে বিরোধীপক্ষ কলাকৌশল আঁটছে। বাঘে মহিষের লড়াইয়ে, অবশেষে ভেনিজুয়েলার নিরীহ জনগণের প্রাণ যাবে। যেকোনো সমস্যার সমাধানে সংলাপের বিকল্প নেই। জাতিসংঘ মহাসচিব সেই আহ্বানই জানিয়েছেন। আমরাও সকল পক্ষের প্রতি সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানাই।

n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়