২০১৮ সালের বছরের শেষ এবং ২০১৯ সালের শুরুতেই মোটা দাগে বিশ্ব রাজনীতির উষ্ণ আবহাওয়ার আঁঁচ পাওয়া যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় রনিল বিক্রমসিংহের প্রত্যাবর্তনের ঘটনা, ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এবং বাংলাদেশের নির্বাচন তবে এখন জোরালোভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাজ্যে থেরেসা মের ব্রেক্সিট চুক্তি বাতিল, ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস নিয়ে তৃণমূলের বিরোধিতা, মেক্সিকোর সীমান্ত ঘেঁষে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অচল অবস্থা পরিস্থিতি এবং ভেনিজুয়েলায় সেনা সদস্যদের অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা। হলফ করে বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতিতে একটা সংকটময় অবস্থা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে থেরেসা মের ব্রেক্সিট চুক্তি বাতিল হওয়া নিয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের মানুষের মধ্যে। এক পক্ষ বলছে ইইউ থেকে বিছিন্ন হয়ে গেলে তারা সর্বসাকুল্যে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অন্য পক্ষ বলছে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য থেকে অভিবাসীদের চাপ কমবে। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপীয় আদালতের এখতিয়ার থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে আনা ছাড়া তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেই ব্রেক্সিট চুক্তিতে। দীর্ঘ ২১ মাসেও তারা সুনির্দিষ্ট মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি, কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য আলাদা হবে এবং ইইউভুক্ত ২৭টি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কেমন হবে? পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি বাতিল হওয়ার পর থেরেসা মে সংকট উতরাতে বিকল্প পরিকল্পনা করে অগ্রসর হচ্ছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না কারণ বিরোধী লেবার পার্টি ‘চুক্তি বিহীন’ বিচ্ছেদে রাজি নন। যার ফলে দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরি নিয়ে সিনেটে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব অনিশ্চিত জেনেও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরো দেশকে জিম্মি করে অচলাবস্থা করে রেখেছেন। এর ফলে প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো বেতন হচ্ছে না গত বছরের ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকে অচলাবস্থার পর। দেশটিতে একটা বিরূপ এবং প্রতিকূল অবস্থা তৈরি হয়েছে। যা দেশের রাজনীতিকে সংকটময় করে তুলছে।
ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে গত ২৩ জানুয়ারি ২৭ জন সেনা সদস্য অভ্যুত্থান চেষ্টা চালায়। খুব কম সময়ের মধ্যে অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন সরকার। অপরদিকে এই গণঅভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছে বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট। ২০১৭ সালে নিকোলা মাদুরো ক্ষমতা থাকাবস্থায় ভেনিজুয়েলার সরকারপন্থী বলে পরিচিত সর্বোচ্চ আদালত পার্লামেন্টের ক্ষমতা খর্ব করে আদেশ দেন যে পার্লামেন্টে বিরোধীদের নেতৃত্ব অবৈধ এবং তাদের সিদ্ধান্ত অকার্যকর হবে। ২০১৮ সালের মে মাসে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন তিনি। অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা এবং বিতর্কিতভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং প্রশ্নবিদ্ধ শাসন ব্যবস্থা নিয়ে ভেনিজুয়েলায় চলছে এখন রাজনৈতিক সংকট।
এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে লোকসভায় নাগরিকত্বের সংশোধনী বিল পাস করেছে বিজেপি কিন্তু রাজ্যসভায় তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিল কার্যকারিতা পাবে না। তৃণমূল বেঁকে বসেছে এ কারণে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে বিলটিতে উল্লেখ্য ভারত ভাগের পর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের থেকে আসা শুধুমাত্র অমুসলিমদের নাগিরকত্ব দেওয়া হবে কেন? তৃণমূল এখন উদ্বাস্তুদের প্রতি আবেগ দেখালেও তাদের শাখের করাত হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
বিজেপি এবং তৃণমূল যে উদ্বাস্তুদের ব্যবহার করছে শুধু ভোটের জন্য তার প্রমাণ মিলে সম্প্রতি ভারতে ভোটের রাজনীতি যখন সরগরম হয়ে উঠছে তখন মোদী বলছেন, উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেবে অন্যদিকে মমতা বলছেন, জমির স্বত্ব দিবেন। এগুলো শুধুই মুখশ্রুতি, ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলছে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ, ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আসা উদ্বাস্তুরা এখনো নাগরিকত্ব পায়নি। অনেকেই জমির স্বত্ব পায়নি।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছেন ২০১১ সালে, দ্বিতীয়বার ২০১৬ সালে। কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে ২০১৪ সালে। এত সময় পেয়েও তারা উদ্বাস্তুদের জন্য এসব অধিকার দেওয়া হয়নি। আদৌ পাবে কি-না তা সন্দেহাতীত। উদ্বাস্তুরাও জানে তা। তবে কেন উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাজনৈতিক খেলা? এর মাধ্যমে কি তাদের অধিকার হনন করা হচ্ছে না? আশার বাণী শুনিয়ে ধোঁকাবাজির রাজনীতি চর্চা রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এবং সংকটাপন্ন করে তুলছে।
দেখা যাচ্ছে, পুরো বিশ্বে রাজনৈতিক সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে এবং প্রতিকূলতা তৈরি হচ্ছে কিন্তু আমরা এটা বিশ্বাস করি, মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়/ আড়ালে তার সূর্য হাসে/হারা শশীর হারা হাসি/অন্ধকারেই ফিরে আসে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
