করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে গত বুধবার থেকে দেশব্যাপী চলছে আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধ। ফলে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের গণপরিবহন। বিশেষ প্রয়োজনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা চলাচলের অনুমতি রয়েছে। তবে রিকশা চালকরা বলছেন, নিম্ন আয়ের পেশাজীবীরা তাদের বাহনে চড়েন না খরচ বাঁচাতে। তারা হেঁটে হেঁটে কর্মস্থলে যান, বাসায়ও ফেরেন হেঁটে। আর মধ্যম ও উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা নিজস্ব পরিবহনে চলাচল করেন। তাই কঠোর বিধিনিষেধে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন রিকশাচালকরা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁও, তেজগাঁও রেলগেট, ফার্মগেট এলাকা ঘুরে রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ রিকশাচালক ও যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখন গণপরিবহন নেই। রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশাই শেষ ভরসা। কিন্তু বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাওয়া আসা পোষায় না নিম্ন আয়ের পেশাজীবীদের।
তেজগাঁও এলাকার রিকশাচালক আবুল কালাম। বয়স পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব। বাসায় মা, স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মা ও এক মেয়ে অসুস্থ। নিয়মিত তার ওষুধ কিনতে হয়। তাদের ওষুধ কেনা ও খাবার খরচ চালাতে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। এক দিন কাজ না করলে সংসার চলে না। তিনি বলেন, ‘পরিবারের প্রয়োজনে রাস্তায় নামতে হয়েছে। যেসব নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কম খরচে গণপরিবহনে চলতেন, এখন তারা বেশি ভাড়ায় রিকশায় উঠতে চান না। আর উচ্চবিত্ত তো নিজেদের গাড়ি নিয়েই চলেন। লকডাউনে গাড়ি না চললেও আমাদের রিকশাচালকদের দৈনিক আয় কমে গেছে। আগে যেখানে সাত-আট শ টাকার ওপরে আয় করতাম, এখন ৪০০ টাকা আয় করাও কঠিন। এরপর রয়েছে পুলিশের ঝামেলা। অনেক সময় পুলিশ রিকশা উল্টিয়েও আটকে রাখে।’
এ রিকশা চালক আরো বলেন, ‘ভীষণ কষ্টে আছি। আগের লকডাউনে অনেকে সহায়তা প্রদান করেছেন। কিন্তু এবারের লকডাউনে কেউ কোনো সাহায্য করেনি। খাওয়া দাওয়া নিয়ে কত যে কষ্টে আছি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।’
আরেক রিকশাচালক হোসেন মোল্লা বলেন, ‘দুই সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে সংসার। দৈনিক ৫০০ টাকার ওপর খরচ থাকলেও আয় সেভাবে নেই। গতবারের লকডাউনে অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এবারের লকডাউনের চিত্র উলটা। অপরদিকে কঠোর লকডাউনের কারণে মানুষ খুব বেশি বের হয় না। যারা বের হয় তাদের অনেকে আবার রিকশাও ওঠে না।’
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে একটি গার্মেন্টসে মাল ওঠা-নামার কাজ করেন আব্দুল রফিক। বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব খানিকটা দূরে। তিনি বলেন, আমাদের আয় সীমিত। হিউম্যান হলারে চলাচল করলে তেমন খরচ হতো না। কিন্তু এখন তো বন্ধ। তবে রিকশা দিয়ে যাতায়াতের মতো টাকা নেই। তাই হেঁটে অফিস করছি।
কাওরান বাজারের সোলাইমান রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজার আলামিন বলেন, ‘আমাদের গ্যারেজে ৮০টি রিকশা আছে। লকডাউন শুইন্যা অনেকে গ্রামে চইল্যা গেছে। যাওয়ার সময় ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেকে কাল যায় নাই । তারা হয়তো আজ যাবে। গ্যারেজ বন্ধ থাকলে আমাদের বউ বাচ্চা নিয়া কেমনে চলবো। সেই চিন্তায় আছি।’
সবুর নামে এক রিকশাচালক বলেন, ‘রংপুর থেকে ১৫ দিন আগে ধার করে টাকা নিয়ে ঢাকা এসেছি। এখন ঢাকা এসে দেখি সবাই বাড়ি চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগের লকডাউনে যাত্রী কম থাকলেও রিকশা তো চালাইতে পারছি। এখন জোর কইর্যা বাইর হইলে তো পুলিশ পিডায়। বাড়িতে বউ পোলাপান সবাই চিন্তা করতেছে। আগে রাস্তার পাশে বসে থাকলে অনেকে চাল ডাউলের প্যাকেট দিয়ে যেত। কিন্তু এবারের লকডাউনে কেউ কোনো সাহায্য করছে না।’
