৮১ বছরের ভালোবাসার মানুষকে চোখের জলে বিদায় রানির

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ২৩:১২

রাজপরিবারের এক জন একান্ত সচিব একবার বলেছিলেন, সারা বিশ্বে প্রিন্স ফিলিপ একমাত্র মানুষ যিনি রানিকে নেহায়েত অন্য একজন মানুষ হিসাবে দেখেন, সেভাবেই তার সঙ্গে ব্যবহার করেন। একমাত্র তিনিই এটা করতে পারেন’। তাদের বিয়ে ছিল প্রেমের। তারা দুজন দুজনকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। তাদের দেখা হয়েছিল বিয়ের অনেক আগেই, ১৯৩৯ সালে। আর গতকাল সেই ভালোবাসার মানুষটিকে চোখের জলে বিদায় জানালেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। খবর বিবিসির

এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত্

প্রিন্স ফিলিপ যখন ডার্টমাথে ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজের ক্যাডেট, তখন ঐ কলেজ পরিদর্শন করেন রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং রানি এলিজাবেথ, সঙ্গে ছিলেন তাদের দুই কিশোরী কন্যা প্রিন্সেস এলিজাবেথ ও প্রিন্সেস মার্গারেট। ঐ সফরে দুই কিশোরী প্রিন্সেসের সঙ্গী হয়ে তাদের সঙ্গ দেন প্রিন্স ফিলিপ। তরুণ প্রিন্স ঐ সফরে ১৩ বছরের প্রিন্সেস এলিজাবেথের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৯ সাল।

১৯৪২ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রিন্স ফিলিপ হয়ে ওঠেন রয়্যাল নেভির তরুণতম ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট। এই সময় তারা দুজন প্রচুর চিঠি চালাচালি করেছেন। বেশ কয়েকবার রাজপরিবারের সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি। এরকমই একটি সফরের পর ১৯৪৩ সালের বড়দিনের সময় এলিজাবেথ তার প্রসাধনের টেবিলে প্রিন্সের একটি ছবি সাজিয়ে রাখেন। তাদের সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে যুদ্ধ পরবর্তী দিনগুলোতে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন রাজপরিবারের কেউ কেউ। কারণ তারা মনে করতেন ফিলিপের আচরণ ‘রুক্ষ্ম ও খুব ভদ্রোচিত’ নয়। কিন্তু প্রিন্সেস এলিজাবেথ বেশ ভালোভাবেই ফিলিপের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।

১৯৪৬ সালের গ্রীষ্মে ফিলিপ রাজার কাছে গিয়ে তার কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন এবং প্রথম সাক্ষাতের আট বছর পর তারা বিয়ে করেন। বিয়ের আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে হয় ফিলিপকে। গ্রিক পদবী বাদ দিয়ে তিনি নেন মায়ের ইংরেজ পদবী মাউন্টব্যাটেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের আগের দিন রাজা ষষ্ঠ জর্জ তাকে ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি দেন। আর বিয়ের দিন সকালে তাকে করা হয় ‘ডিউক অফ এডিনবরা।’ ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সময় উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটেনের ধূসর দিনগুলোতে ঐ বিয়ে ছিল ‘রঙের ঝলকানি।’ ১৯৫২ সালে তারা যখন কেনিয়ায় তখন প্রিন্স ফিলিপই স্ত্রী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে খবর দেন যে, তার (এলিজাবেথ) বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা গেছেন এবং তিনিই ২৫ বছর বয়সে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের রানি হচ্ছেন।

নিজের এবং স্ত্রীর দৃষ্টিতে প্রিন্স ফিলিপ

ব্রিটিশ জীবনে তার অবদান সম্পর্কে জিগ্যেস করার পর অকপটে প্রিন্স ফিলিপ জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার যা সেরা, সেটাই আমি করার চেষ্টা করেছি। অনেকে মনে করেন, যার করেছি, ঠিকই করেছি। অনেকে তা মনে করে না। আপনি কী করতে পারেন? আমি যেভাবে কাজ করি, সেটা তো আমি বদলাতে পারব না। এটাই আমার স্টাইল?।’ তবে প্রিন্স ফিলিপ বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন তার খোলামেলা মন্তব্য বা অসংবেদনশীল বর্ণবাদী মন্তব্যের কারণে। একবার ১৯৮৬ সালে চীন সফরে গিয়ে তিনি সেখানে একদল ব্রিটিশ ছাত্রকে বলেন, ‘এখানে বেশি দিন থাকলে তোমাদেরও কিন্তু চেরা চোখ হয়ে যাবে।’

সমালোচকরা মনে করেন তিনি বেশি বেফাঁস কথা বলেন আর তিনি একেবারেই সেকেলে। তবে যারা তার পক্ষে, তারা যুক্তি দেন যে, তিনি ভিন্ন যুগের মানুষ, একটু রসিকতা করার চেষ্টা করেন। যারা ভেতরের খবর জানেন, তাদের মতে, এই হাস্যরসই আসলে প্রিন্স ফিলিপ এবং রানিকে এক করে রেখেছিল। তবে তিনি নিজে বলেছেন, এক্ষেত্রে সব কৃতিত্ব আসলে রানির সহনশীলতার।

রানির সব বক্তৃতা একসময় শুরু হতো, ‘আমার স্বামী এবং আমি’ এই বলে। এটা নিয়ে ১৯৬০ এর দশকে বেশ রঙ্গ-রসিকতা হতো। এরপর তিনি এই কথা বলা বন্ধ করে দেন। তবে আবেগটা থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এখন তিনি কেবলই ‘আমি।’ তাদের বিয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে রানি তার স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন এভাবে :‘বেশির ভাগ সময়, আমার মনে হয়, প্রিন্স ফিলিপকে কেবল আমার বক্তৃতা শুনতে হয়। তবে আমরা কোনো বক্তৃতার আগে এটা নিয়ে বেশ আলোচনা করি এবং আপনারা নিশ্চয়ই ধারণা করতে পারেন, তার মতামত আমার বক্তৃতায় সোজাসুজিই প্রতিফলিত হয়। তিনি এমন একজন, যিনি সহজে নিজের প্রশংসা গ্রহণ করেন না, কিন্তু সোজা কথায় বলতে গেলে, তিনিই আমার জীবনের সাহস, এত বছর ধরে তিনি এবং তার পুরো পরিবার আমার পাশে আছেন। এই দেশ এবং বিশ্বের আরো অনেক দেশের অনেক ঋণ তার কাছে, তিনি যতটা দাবি করেন, বা যতটা আমরা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি।’ স্পষ্টবক্তা প্রিন্স ফিলিপ যে রানির মনের রাজা ছিলেন তা তাদের ৭৩ বছরের জীবনযাত্রা দেখেই সহজে বোঝা যায়। যাযাবর রাজকুমার এবং লাজুক রাজকুমারী এক সময় একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠেন। ৯৪ বছরের রানি তার ৯৯ বছর বয়সি স্বামী প্রিন্স ফিলিপকে হারিয়েছেন গত ৯ এপ্রিল সকালে।