জর্ডানের রাজপরিবারে বিরোধের পদধ্বনি

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২১, ২১:০৫

এম এ আলআমিন

 

জর্ডানের হাশেমী চলতি মাসে প্রতিষ্ঠার শততম বার্ষিকী পালন করছে। এমন এক সময় এই বার্ষিকী পালিত হচ্ছে যখন রাজপরিবারের ভেতরকার অন্তর্কলহ তীব্র হয়েছে। এবারের দ্বন্দ্বে উঠে এসেছে সাবেক ক্রাউন প্রিন্স হামজার নাম। জর্ডানের ক্ষমতার শীর্ষে টানাপড়েন শুরু হয়েছিল সপ্তাহ দুই আগে।

দুই সপ্তাহ আগে জর্ডানে একটি অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়। বাদশাহ আব্দুল্লাহর সরকার অবশ্য এ অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। এতে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন প্রিন্স হামজা। আব্দুল্লাহর সত্-ভাই এর আগে বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা যায়। তাকে ট্রাইবাল কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার জন্য বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির জন্য গোত্রগুলোর মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। ধারণা করা হয় এই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে হামজা আব্দুল্লাহর ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। হামজা ট্রাইবগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়। ট্রাইবাল কমিউনিটিগুলো মনে করে সংকট মোকাবিলায় হামজা আব্দুল্লাহর চেয়ে উপযুক্ত। আটকদের মধ্যে আবদুল্লাহর একজন উপদেষ্টা এবং রাজপরিবারের এক সদস্যও আছেন। শীর্ষ পর্যায়ের এসব লোকদের আটকের ঘটনা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর বিষয়।

বিবিসির কাছে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় প্রিন্স হামজা তার দেশের সরকারকে দুর্নীতিপরায়ন এবং অদক্ষ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হয়রানির আশঙ্কায় লোকজন এসব নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। তিনি বলেন, গত দুই দশকে প্রশাসন যেভাবে ভেঙে পড়েছে, সরকারের ভেতর যে অদক্ষতা ও দুর্নীতি দেখা গেছে তার জন্য তিনি দায়ী নন। রাজপরিবারের এক সদস্যের মধ্যস্থতার পর সংকট বেশিদূর গড়ায়নি। তবে এই ঘটনার পেছনে সৌদি আরবের হাত আছে বলে অনেকে অঙ্গুলি ইশারা করেছেন। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির নিরসন করতে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান দ্রুত জর্ডান সফর করেন। তিনি বলেন, বাদশাহ আবদুল্লাহ এবং তার সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সৌদি কর্মকর্তারা বলেছেন, ছোট একটি প্রতিবেশী দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন।

বিবিসির নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার লিখেছেন, এখানে দুটো বিষয় আছে। একটি হচ্ছে সাবেক বাদশাহ হোসেনের বড় ছেলে হামজা, সম্প্রতি বিভিন্ন গোত্রের ক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এই ঘটনায় যারা আটক হয়েছেন তাদের মধ্যে বাসেম আওয়াদুল্লাহ। তিনি জর্ডানের রাজকীয়    আদালতের সাবেক প্রধান এবং বর্তমানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ           বিন সালমানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। তার         জর্ডান এবং সৌদি আরবের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং শাসকের সঙ্গেও               তার ভালো সম্পর্ক। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার যোগাযোগ ভালো।

জর্ডানের প্রাকৃতিক সম্পদ খুব বেশি নেই। ইরাক ও সিরিয়া থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে দেশটি। করোনাকালে অন্য অনেক দেশের মতো জর্ডানের পর্যটন শিল্পও বিপর্যস্ত। পাশাপাশি সরকারের নানা অব্যবস্থাপনায় মানুষের ক্ষোভও বেড়েছে। এসব সত্ত্বেও আঞ্চলিক জর্ডান সরকারের প্রতি রয়েছে আস্থা। বাদশাহ আব্দুল্লাহ সরকারের পতন ঘটুক, প্রতিবেশী কোনো দেশই এটা চায় না। কারণ সেখানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটলে তার প্রভাব আশপাশের দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জর্ডানের হাশেমী রাজতন্ত্র ব্রিটেনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ঠিক এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক যেরকম। ১৯২১ সালের ১১ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসিত জর্ডানে এই রাজপরিবার ক্ষমতাসীন হয়। ব্রিটেনের কর্তৃপক্ষ আরব উপদ্বীপ থেকে পরিবারটিকে বাছাই করে আনে। শাসক হিসেবে পরিবারটির রাজকীয় বিত্তবৈভব বা শান শওকত তেমন ছিল না। তা সত্ত্বেও পরিবারটি যুগের পর যুগ ধরে সফলভাবে শাসন করে এসেছে। কারণ ট্রাইবাল কমিউনিটির সঙ্গে সরকার সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৯৯৯ সালে বাদশাহ হোসেনের ইন্তেকালের পর ক্ষমতাসীন হন আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ এখন মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা রাজন্য। তার সময় ট্রাইবাল কমিউনিটির সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর জর্ডান সময় সময় বহু শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রথম প্রবাহটি জর্ডানে প্রবেশ করে। এরপর ১৯৬৭ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের পর শরণার্থীর দ্বিতীয় ঢল সামলাতে হয় দেশটিকে। এরপর ৯০-এর দশকে ইরাকি ও সম্প্রতি সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয়স্থান হয়ে উঠেছে জর্ডান। অর্থনৈতিক সংকট কঠিন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জটিল হয়েছে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা।