শিক্ষিত মানুষ কেন কৃষিকাজ করতে চায় না

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২১, ২২:০১

দেশ ও মাটি একে অপরের পরিপূরক। আর সেই মাটির সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন কৃষক। মাটি ছাড়া যেমন দেশ কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি কৃষক ছাড়াও মাটির কদর হয় না। নিবিড় যত্নে ও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাটির বুকে সবুজ ফসলের হাসিতেই যাদের আত্মতৃপ্তি। কারণ এ মাটিই তাদের জীবন ও জীবিকা। তাই তো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার কৃষকের গান কবিতায় বলেছেন, ‘এ বন্ধ্যা মাটির বুক চিরে এইবার ফলাব ফসল—আমার এ বলিষ্ঠ বাহুতে আজ তার নির্জন বোধন।’

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে কৃষি আর কৃষক কতটা জড়িয়ে আছে সেটা কমবেশি সবারই বোধগম্য। তাদের পরিশ্রমের পাল্লা দুঃসাধ্য অথচ প্রাপ্তির পাল্লা আকাশছোঁয়া। অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা যেমন পিছিয়ে আছে তেমনিভাবে সামাজিক স্বীকৃতির দিক থেকেও অবহেলিত সেই আদিলগ্ন থেকেই। কৃষিকাজ কি আসলেই খুব লজ্জাজনক পেশা? কৃষিকাজ করাটা যদি সত্যিই লজ্জা বা অপ্রয়োজনীয় হতো, তাহলে দেশের বেশির ভাগ অর্থাত্ ৪১ শতাংশ মানুষ কৃষিকে কেন পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন। কেনই-বা আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। দেশজ উত্পাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। খাদ্যশস্য উত্পাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দশম। দারিদ্র্য, ঘনবসতি, নগরজীবনের নানা অনিশ্চয়তা আর জলবায়ুর পরিবর্তনের ভেতর বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও টিকে থাকার মূল জায়গাটি হচ্ছে ভূমি ও কৃষক সম্প্রদায়। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা বর্তমান করোনাকালীন উপলব্ধি করেছি। করোনা মহামারিতে যখন দেশের শিল্প খাত, সেবাখাত, তৈরি পোশাকশিল্প, রপ্তানি খাতের যায় যায় অবস্থা, সেই সময়ে কৃষি খাত বরাবরের মতো সুখবর দিয়েছে। মায়ের মমতায় আগলে রেখে খাদ্যসংকটের সম্ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কৃষি খাত। তাই কৃষকদের মর্ম এসি রুমে নরম গদিতে বসে স্থূল মস্তিষ্কে বোঝা অসম্ভব।

কৃষক আমাদের হাসিমুখের কারণ হলেও বাংলাদেশের প্রত্যেকটি কৃষকের চেহারা মলিন। তারা আমাদের সর্বোচ্চটা দিলেও তাদের প্রাণে নেই উচ্ছ্বলতা, মুখে নেই হাসি। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই সঙ্গে কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও নতুন জাত সংযুক্ত হওয়ায়, মূলধন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে থেকে বিভিন্ন শর্তে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই সরকার কর্তৃক মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তাদের শর্তের মারপ্যাঁচে পরে বাধ্য হয়ে তারা কম দামে ফসল বিক্রি করে। কৃষি বাংলাদেশের এত বড় একটি খাত অথচ এই খাতের একটি বড় সমস্যা হলো কোন শিক্ষিত মানুষ কৃষিকাজ করতে চায় না। কৃষিকাজে এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি এসেছে, যার সঠিক ব্যবহার কৃষকরা শিক্ষার অভাবে করতে পারেন না। যার ফলে আমাদের উর্বর ভূমিতে পর্যাপ্ত ফসল ফলে না। এ ঘাটতির জন্য একমাত্র সামাজিক বৈষম্যই দায়ী। আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের হার ব্যাপক। এই বেকাররা যদি কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করত, তাহলে হয়তো আমাদের কৃষি খাত আরো সমৃদ্ধ হতো, সঙ্গে বেকারত্বও  হ্রাস পেত।

দেশ ও জনতাকে সমৃদ্ধ করতে হলে শুধু কৃষিকে নয়, কৃষককেও মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষিত মানুষকে কৃষিকাজে আগ্রহী করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে কৃষি প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। মূলধনের অভাবে যাতে কম মূল্যে শস্য বিক্রি না করতে হয়, সেজন্য সরকার কর্তৃক কৃষকদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু কৃষক নয়, ছোট-বড় সব পেশাজীবী মানুষের ওপর শিশু ও তরুণ প্রজন্মের যাতে সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় সে বিষয়টি পরিবারকেই নিশ্চিত করতে হবে। কৃষির অপর নাম খাদ্য। আর খাদ্য যদি মৌলিক পাঁচটি অধিকারের একটি হয়, তাহলে কৃষি ও কৃষককে বাঁচানোও আমাদের প্রত্যেকটি নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া