বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা
বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ডায়রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভা থেকে নারী শিশুসহ অনেক রোগী ভর্তি হচ্ছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের সরবরাহ নেই। ফলে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ওষুধ ও স্যালাইন কিনতে হচ্ছে।
৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর তুলনায় শয্যা সংখ্যা কম থাকায় রোগীদের মেঝে, বেঞ্চের ওপরে ও হাসপাতালের বারান্দায় এমনকি গাছতলায় বসে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে স্যালাইন নিতে হচ্ছে। এছাড়া ডায়রিয়া ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিত্সক না থাকায় কর্মরত সেবিকা ও প্রশিক্ষণবিহীন আয়া দিয়ে চিকিত্সা দিতে হচ্ছে।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল বেলা ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এখান থেকে চিকিত্সা নিয়েছে, গড়ে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় শতাধিক ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হলেও তুলনামূলক ছাড়পত্র অনেক কম, তাই হাসপাতালের সর্বত্র ঠাসাঠাসি করে রোগীরা অবস্থান করছে এমনকি করোনা স্বাস্থ্যবিধিও মানা হচ্ছে না কোথাও।
ভরপাশা ইউনিয়নের ভাঙ্গাপুল এলাকার আ. খালেকের পুত্র শাহজাদা জানান, গত ১৭ এপ্রিল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে এখানে আসি। কিন্তু এখান থেকে মাত্র একটি স্যালাইন দেওয়া হয়। সেটা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বাইরে থেকে স্যালাইনসহ দেড় হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।
এছাড়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লিটন সাহার স্ত্রী সাথী সাহা (২৭) হাসপাতালের আরেকজন ডায়রিয়া রোগী। লিটন জানান, গত ১৬ এপ্রিল স্ত্রীকে ভর্তি করার পর চারটি স্যালাইন হাসপাতাল থেকে দিয়েছে, অন্য সব ওষুধ ও স্যালাইন বাইরের ফার্মেসি থেকে তিন গুণ দামে কিনতে হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ইসমত জেরিন জুঁই বলেন, এখানে ডায়রিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করার পর প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় রোগী এলে তাত্ক্ষণিকভাবে রোগীকে হাসপাতালের স্যালাইন দিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। পরে রোগীদের মধ্যে স্বাবলম্বী কাউকে হয়তো বা বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হয়। হাসপাতালে চিকিত্সকসহ জনবল সংকট থাকায় আমাদেরকে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, যে হারে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাধবী রায় বলেন, বাকেরগঞ্জে সম্প্রতি ডায়রিয়ার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের সংকট দেখা দেওয়ায় অসহায় মানুষদের জন্য উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১ হাজার অ্যাম্পুল আইপি স্যালাইন, জন স্বাস্থ্য প্রকৌশলের পক্ষ থেকে ২ হাজার ৫০০ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রদান করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য বেগম নাসরিন জাহান রতনা জানান, বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডায়রিয়া চিকিত্সায় ওষুধের সংকট দেখা দিলে আমার পক্ষ থেকে আপাতত ১ হাজার অ্যাম্পুল আইপি স্যালাইন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে। সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও ওষুধের সংকট নিরসনে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কাঁঠালিয়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে
কাঁঠালিয়া (ঝালকাঠি) সংবাদদাতা জানান, কাঁঠালিয়ায় হঠাত্ করে ডায়রিয়ার প্রকোপ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল রবিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন কাঁঠালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, কাঁঠালিয়া সদর ও আওরাবুনিয়া দুটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ ১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকে দুই শতাধিক ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছেন।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যা না থাকায় ওয়ার্ড, ওর্য়াডের মেঝে ও করিডোরের মেঝেসহ হাসপাতালের সিঁড়িতে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। এদিকে হাসপাতালে কলেরা স্যালাইন ও ডায়রিয়া চিকিত্সা সংশ্লিষ্ট ইনজেকশন ও ওষুধ না থাকায় রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের ওষুধের দোকানেও কলেরার স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না। ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপস কুমার তালুকদার জানান, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছি।
চরফ্যাশনে একদিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭০
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, ভোলার চরফ্যাশনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত আট দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চরফ্যাশন উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২৯ জন রোগী। গতকাল রবিবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মহিলা ও শিশুসহ একদিনেই এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭০ জন। চরফ্যাশন হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহাবুব কবির এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালটিতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা কম থাকায় বারান্দায় রোগীদের চিকিত্সা দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় চিকিত্সা নিতে রোগীদের যেমন সমস্যা হচ্ছে তেমনি চিকিত্সা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিত্সক এবং নার্সদের।
চরফ্যাশন হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহাবুব কবির জানান, রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এক মাসের স্যালাইন তিন দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে স্যালাইন সংকট দেখা দিতে পারে।
