ভাবনায় প্রবীণ নাগরিক

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫৪

বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। চিকিত্সাসেবার উন্নয়নে মানুষ উন্নত চিকিত্সাব্যবস্থা পাওয়ার ফলে মৃত্যুহার কমে গিয়েছে। ফল হিসেবে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭০ বছরের ওপরে। এতে করে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ প্রবীণ, যা ২০৩০ সালে ১১ দশমিক ৫ এবং ২০৫০ সালে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এ সময় প্রতি পাঁচ জন মানুষের মধ্যে একজন প্রবীণ হবেন। একসময় কঠোর শ্রম দেওয়া মানুষগুলোই বয়সের ভারে আজ প্রবীণ। পরিবারের জন্য জীবন উত্সর্গ করা মানুষগুলো আজ কর্মহীন হয়ে পরিবারেরই অবহেলার শিকার। পরিবার যেখানে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেখানে অন্য কেউ প্রবীণদের আশ্রয় হয়ে উঠবে? তাই দিনে দিনে প্রবীণরা সমাজ-সংসারে অবহেলিতভাবে সময় পার করছেন। এই প্রবীণদের নিরাপত্তা, মর্যাদা আর সেবার দায়িত্ব কে নেবে? সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে প্রবীণদের জন্য কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করলেও তা সর্ববিবেচনায় অপ্রতুল। এই সামাজিক নিরাপত্তা বলয় দেশের প্রবীণদের জন্য কোনো নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয় না। বলয়ের মধ্যে আসার সুযোগ পাওয়া প্রবীণরাও অতীতের মতোই অসম্মানের মধ্যে দিন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাদের বয়স ৬০ বা তার উপরে তাদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রবীণরা যাতে নিপীড়নের শিকার না হন, কোনো রকম বৈষম্যের শিকার না হন, অবহেলিত না হন তার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি আশা রাখেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য কল্যাণকর কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। দেশের প্রবীণ নাগরিকদের মর্যাদাবান রাখতে রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশা বিশাল। রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশার তালিকায় রয়েছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে স্বীকৃতি ও পরিচিতিসহ ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে সমাজে বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত ও আর্থিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাপ্রাপ্তি।

দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি তরুণ। সরকার এই তরুণ জনশক্তিকে দেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যুক্ত করতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তরুণ সমাজ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন করে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ভূমিকা রাখছে। দেশ আশা করছে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করবে। আজকের তরুণ সমাজ আগামী দিনে প্রবীণ হবে। এই তরুণ সমাজকে দেশ ও জাতির কল্যাণে শতভাগ নিবেদিত করতে হলে তাদের আগামী দিনগুলো সুখকর থাকবে, এমন একটা চিত্র তরুণদের সামনে রাখা প্রয়োজন।  সে কারণেই দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই প্রবীণ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি। আজকের তরুণরা যেন চোখ বন্ধ করে দেখতে পায়, তাদের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত নিজেরই ভবিষ্যত্।

দেশের সাধারণ মানুষের চাহিদা খুব কম। খুব অল্পে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। সারা দিনের পরিশ্রমের পর পেটপুরে ভাত খেয়ে একটা চালের নিচে বিছানায় ঘুমাতে পারলেই সিংহভাগের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। তাই বলে এ মানুষগুলো বয়স্কভাতার নামে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের ৫০০ টাকায় ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও পারে না। একজন সাধারণ বয়স্ক মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ৫০০ টাকা কি অনেক? সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দিকে তাকালে মনে হবে ভাবছেন ৫০০ টাকায় সবকিছু করা সম্ভব।

সরকার পিতা-মাতার ভরণপোষণ-বিষয়ক আইন পাশ করেছে। সক্ষম সন্তান যদি এ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। সরকারি আইনে পিতা-মাতার ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার জন্য সক্ষম সন্তানদের পালনীয় ভালো অনেক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায়, পিতা-মাতার প্রতি অক্ষম সন্তানদের দায়িত্ব কি তাহলে সরকার গ্রহণ করবে? আমাদের যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। গ্রামে একটা প্রচলিত কথা আছে, ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না’। যৌথ পরিবারে প্রবীণ সদস্যদের যে নিরাপত্তাটুকু ছিল সে কাঠামো না থাকার ফলে প্রবীণরা আজ বোঝা হয়ে গিয়েছে। অপাঙেক্তয় হয়ে পড়েছে। পিতা-মাতা অনেক পরিবারের কাছে ভাগের মা হয়ে গিয়েছে। প্রবীণদের তরুণ জীবনের অবদানকে স্বীকার করলে আজ এমন পরিস্থিতি হতো না। তাই সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু আইন করে মুক্তির পথ পাওয়া যাবে না।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, আর্থিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার আগে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের সবার বিশ্বাস, সরকারি যে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির প্রথম হকদার ব্যক্তি আমি। কোনো নিয়মনীতি এখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা মানুষগুলোর বেশর ভাগই সরকারের সব রকমের সহায়তায় প্রথমেই ভাগ বসাতে চেষ্টা করেন। সব শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে আজ একই প্রবণতা। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে দেখা যায় বিত্তবান, চাকরিজীবী ইত্যাদি অনেক মানুষ বলয়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। সরকারি সুবিধার নীতি মেনে সুষম বণ্টনের পরিবেশ নেই কোথাও। তদুপরি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি ব্যাংক, বিমা এমনকি মাছধরার ট্রলার পর্যন্ত একজন ব্যক্তির নামে। তাই সরকার প্রবীণ নাগরিকদের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলেও এসব ক্ষমতাবান প্রথমেই তা ভোগ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। প্রয়োজন বিবেচনায় কেউ ছাড় দিতে রাজি হবে না। তাই সরকার প্রবীণ নাগরিকদের জন্য কোনো সম্মানীর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে বড় বড় শিল্পপতি, বড় বড় ব্যবসায়ী, বড় বড় চাকুরে নিজেদের পরিবারের জন্য প্রথম সম্মানীটা গ্রহণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়বে, এতে ভয় পাওয়ার বা অবাক হওয়ার কিছু নেই।

বাংলাদেশ এখন উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পথে জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। সেই বিচারেই মহামান্য রাষ্ট্রপতির বিশাল প্রত্যাশা প্রবীণ নাগরিকদের জন্য। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে সরকার রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশা পূরণে নিবেদিত হবে। মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করবে। বর্তমানে সারা দেশে প্রবীণ নাগরিকরা একত্রিত হচ্ছেন। আগে এটা ছিল কিছু মানুষের কাছে অবসর কাটানোর একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কিন্তু আজ দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক মর্যাদায়, নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য একত্রিত হওয়াটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তাই সুন্দর আগামীর জন্য তরুণ প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে এখনই কিছু কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সড়ক-রেল-নৌ-বিমানপথে ১০ শতাংশ সিট বরাদ্দ রাখা, ভাড়ার ২৫ শতাংশ কম করা, হাসপাতালে ২০ শতাংশ সিট বরাদ্দ রাখা, সর্বত্র প্রবীণদের জন্য পৃথক লাইনের ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি কিছু কার্যক্রম এখনই গ্রহণ করা সম্ভব। এতে আর্থিক যোগের সুযোগ নেই। সরকারের শুধু সদিচ্ছা থাকলেই এমন বেশ কিছু উদ্যোগ প্রবীণ নাগরিকদের জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রত্যাশাও অনেকাংশে পূরণ হবে।

n লেখক : প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)